logo

ইতিহাসের ধারণা: WBBSE ক্লাস 10 ইতিহাস (History)

Leave a Comment

post

এখানে (chapter 1) ইতিহাসের ধারণা: WBBSE ক্লাস 10 ইতিহাস (History) (Bengali medium) আধুনিক ভারতের ইতিহাস ও পরিবেশ (Adhunik Bharater Itihas O Poribesh)-এর উত্তর, ব্যাখ্যা, সমাধান, নোট, অতিরিক্ত তথ্য, এমসিকিউ এবং পিডিএফ পাওয়া যাবে। নোটগুলো শুধুমাত্র রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করুন এবং প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করতে ভুলবেন না।

Select medium
English medium notes
Bengali medium notes
If you notice any errors in the notes, please mention them in the comments

সারাংশ (summary)

ইতিহাস মানে শুধুমাত্র রাজা-মহারাজাদের যুদ্ধের গল্প নয়। এখন ইতিহাস মানে হলো সমাজের সাধারণ, রোজকার মানুষদের জীবনের কথা জানা। এই অধ্যায়ের নাম ইতিহাসের ধারণা (Itihaser Dharona)।

আগেকার দিনে ইতিহাস লেখা হতো শুধু বড় বড় নেতা বা রাজাদের নিয়ে, যেন উপর থেকে নীচের দিকে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এখন ইতিহাস লেখা হয় সাধারণ মানুষদের জীবন দিয়ে, যেন নীচ থেকে উপরের দিকে দেখা হচ্ছে। একে বলা হয় নতুন সামাজিক ইতিহাস। ফ্রান্সের কিছু ঐতিহাসিক এই ধরনের ইতিহাস লেখা শুরু করেছিলেন। এই নতুন ইতিহাসে আমরা সমাজের সব দিকের ছবি পাই।

যেমন, মানুষের খাবারদাবার কেমন ছিল বা তারা কী পোশাক পরত, তা থেকেও আমরা সেই সময়ের মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের পছন্দ বা অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝতে পারি। খেলাধুলার ইতিহাসও খুব জরুরি। যেমন, মোহনবাগান ক্লাবের ফুটবল জয়ের ঘটনা শুধু একটা খেলার জয় ছিল না, সেটা পরাধীন ভারতের মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছিল। এখন মেয়েরাও খেলাধুলা আর তার দর্শক হিসেবে এগিয়ে আসছে, এটাও ইতিহাসের একটা জরুরি দিক।

শিল্পের বিভিন্ন দিক, যেমন গান, নাচ, নাটক, সিনেমা, ছবি আঁকা – এগুলোর মাধ্যমেও আমরা পুরোনো সময়ের মানুষের ভাবনা, অনুভূতি ও সমাজের বদল বুঝতে পারি। পুরোনো দিনের বাড়িঘর বা স্থাপত্য দেখেও সেই সময়ের মানুষের শিল্পজ্ঞান ও জীবনযাত্রা জানা যায়। কীভাবে মানুষ আগে যাতায়াত করত, পায়ে হেঁটে বা গরুর গাড়ি চেপে, আর এখন কত দ্রুত এরোপ্লেন বা ট্রেনে যাতায়াত করে – এই যানবাহন আর যোগাযোগের ব্যবস্থার বদলও ইতিহাসের অংশ।

এছাড়া, কোনো একটা ছোট জায়গার ইতিহাস (স্থানীয় ইতিহাস), শহরের বেড়ে ওঠার গল্প (শহরের ইতিহাস), যুদ্ধের কারণ ও তার প্রভাব (সামরিক ইতিহাস), প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক (পরিবেশের ইতিহাস), বিজ্ঞান ও চিকিৎসার উন্নতি (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাস) আর নারীদের কথা (নারী ইতিহাস) – এই সবকিছুই এখন ইতিহাসের জরুরি বিষয়।

এই ইতিহাস জানার জন্য আমরা নানা জিনিস ব্যবহার করি। যেমন, পুরোনো সরকারি কাগজপত্র, রিপোর্ট বা চিঠি (যেমন মেকলের লেখা বা ডালহৌসির চিঠি)। আবার, অনেক বিখ্যাত মানুষ নিজেদের জীবন নিয়ে বই লিখেছেন (আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা), যেমন বিপিনচন্দ্র পালের ‘সত্তর বৎসর’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’ বা সরলাদেবী চৌধুরানীর ‘জীবনের ঝরাপাতা’। ব্যক্তিগত চিঠি, যেমন জওহরলাল নেহরুর তাঁর মেয়ে ইন্দিরাকে লেখা চিঠিগুলোও খুব দরকারি। পুরোনো দিনের খবরের কাগজ ও পত্রিকা (যেমন ‘বঙ্গদর্শন’ বা ‘সোমপ্রকাশ’) থেকেও অনেক কথা জানা যায়। ছবি বা ফটোগ্রাফিও আমাদের পুরোনো সময় দেখতে সাহায্য করে। তবে, কোনো লেখা বা ছবি দেখার সময় একটু সতর্ক থাকতে হয়, কারণ যিনি লিখেছেন বা ছবি তুলেছেন, তার নিজের ভাবনার ছাপ তাতে থাকতে পারে।

তাই, ইতিহাস আসলে শুধু ছেলেদের বা বড় মানুষদের গল্প নয়, এটা সবার গল্প, মেয়েদেরও গল্প, আমাদের সবার জীবনের কথা।

পাঠ্য প্রশ্ন ও উত্তর (Prantik textbook)

সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করো

ক) নতুন সামাজিকইতিহাসযাদের কথা বলে তারা হল–

(i) রাজা-মহারাজা
(ii) সামন্ত প্রভু
(iii) সাধারণ মানুষ
(iv) বড় মানুষ

উত্তর: (iii) সাধারণ মানুষ

খ) ভারতে ফুটবল খেলা প্রবর্তন করেন—

(i) ইংরেজরা
(ii) ওলন্দাজরা
(iii) ফরাসিরা
(iv) পোর্তুগীজরা

উত্তর: (i) ইংরেজরা

গ) ‘মেক্‌লে মিনিট্স’ এ যে বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে তা হল—

(i) সমাজ
(ii) শিক্ষা
(iii) অর্থনীতি
(iv) রাজনীতি

উত্তর: (ii) শিক্ষা

ঘ) ‘সত্তর বৎসর’ গ্রন্থটি যার জীবনকে অবলম্বন করে রচিত তিনি হলেন-

(i) সরলাদেবী চৌধুরানী
(ii) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(iii) বিপিনচন্দ্র পাল
(iv) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

উত্তর: (iii) বিপিনচন্দ্র পাল

নীচের বিবৃতি গুলির মধ্যে কোটি ঠিক কোটি ভূল লেখো

১. ইংল্যান্ডে নতুন সামাজিক ইতিহাসের চর্চা অ্যানাল্স স্কুল নামে পরিচিত ছিল।

উত্তর: ভুল

কারণ: অ্যানালস্ স্কুল ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ইংল্যান্ডে নয়। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে মার্ক ব্লখ ও লুসিয়েন ফেভর দি অ্যানালস্ (The Annales) নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই স্কুলটি সামাজিক ইতিহাস রচনার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করেছিল।

২. নবান্ন নাটকটির রচয়িতা হলেন বিজন ভট্টাচার্য্য।

উত্তর: ঠিক

কারণ: উল্লেখ আছে যে, “নবান্ন” নাটকটির রচয়িতা বিজন ভট্টাচার্য্য। এটি বাংলা নাটকের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ যা সমসাময়িক চিত্র তুলে ধরে।

৩. গন্ধার শিল্প ইন্দো-ইসলামিক সমন্বিত শিল্পরীতির নিদর্শন।

উত্তর: ভুলকারণ: গন্ধার শিল্প ইন্দো-ইসলামিক সমন্বয়ের পরিবর্তে গ্রিক ও রোমান শিল্পরীতির সঙ্গে ভারতীয় শিল্পরীতির সমন্বয় ঘটেছিল। এছাড়াও ইরানীয় ও মধ্য এশীয় শিল্পের প্রভাবও গন্ধার শিল্পে লক্ষ্য করা যায়।

প্রদত্ত ভারতবর্ষের মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত করো

(ক) আলিগড
(খ) বারাণসী
(গ) দিল্লি
(ঘ) পানিপথ

উত্তর:

বামস্তম্ভের সঙ্গে ডানস্তম্ভ মেলাও
বামস্তম্ভজনস্তম্ভ
(i) সত্যজিৎ রায়(a) অমৃতবাজার
(ii) ভরতমুনি(b) অস্কার
(iii) বঙ্কিমচন্দ্র(c) বঙ্গদর্শন
(iv) শিশিরকুমার ঘোষ(d) নাট্যশাস্ত্র

উত্তর:

বামস্তম্ভজনস্তম্ভ
(i) সত্যজিৎ রায়(b) অস্কার
(ii) ভরতমুনি(d) নাট্যশাস্ত্র
(iii) বঙ্কিমচন্দ্র(c) বঙ্গদর্শন
(iv) শিশিরকুমার ঘোষ(a) অমৃতবাজার
একটি বাক্যে উত্তর দাও

৫। একটি বাক্যে উত্তর দাও

ক. সামাজিক ইতিহাস ক-টি পর্বে বিভক্ত?

উত্তর: সামাজিক ইতিহাস মূলত দুটি পর্বে বিভক্ত।

খ. ‘শিল্প একটি অভিজ্ঞতা’-এই মন্তব্যটি কার?

উত্তর: ‘শিল্প একটি অভিজ্ঞতা’ (Art as Experience) এই ধারণাটি আমেরিকান দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ জন ডিউই (John Dewey)-এর সাথে বিশেষভাবে যুক্ত। তিনি তাঁর ১৯৩৪ সালের বিখ্যাত গ্রন্থ “Art as Experience”-এ এই ধারণাটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন।

গ. ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার প্রকাশনা কিছুদিন স্থগিত রাখতে হয়েছিল কেন?

উত্তর: ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে নির্ভীক মত প্রকাশের কারণে সরকারি রোষের স্বীকার হওয়ায় এবং ‘ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট’-এর কোপে পড়ে ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার প্রকাশনা কিছুদিন স্থগিত রাখতে হয়েছিল।

ঘ. কত খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদর্শন পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়?

উত্তর: ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদর্শন পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

ঙ. সরকারি নথিপত্র কোথায় সংরক্ষণ করা হয়?

উত্তর: সরকারি নথিপত্র সাধারণত জাতীয় বা রাজ্য মহাফেজখানায় (National or State Archives) সংরক্ষণ করা হয়।

চ. ‘ছেঁড়া তমসুক’-এর লেখক কে?

উত্তর: ‘ছেঁড়া তমসুক’ নাটকটি সমরেশ বসুর লেখা অবলম্বনে রচিত হয়েছিল।

সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন

ক. মানুষের খাদ্যাভ্যাস সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?

উত্তর: খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস চর্চা মানুষের সামাজিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। খাদ্য মানুষের একটি প্রাথমিক চাহিদা। সময়ের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আসলে মানুষের জীবনযাত্রার বিবর্তনের কথাও বলে। খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসচর্চা যেমন মানুষের চাহিদা, রুচি, সংস্কৃতি ইত্যাদির সময়ানুযায়ী নতুন ধারার সন্ধান দেয়, তেমনি দিক নির্দেশ করে সমাজের সামগ্রিক পটপরিবর্তনেরও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস কীভাবে মানুষের খাদ্যাভ্যাসকে প্রভাবিত করে, তার নিরপেক্ষ বর্ণনাও খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসচর্চার এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিশ্বায়নের প্রভাব মানুষের খাদ্যাভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করে কিনা বা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আসলে সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতারই পরিচায়ক কিনা খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসচর্চা সেই বিতর্কেরই অবকাশ রাখে।

খ. বিশ্বায়ন মানুষের পোশাক পরিচ্ছদকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

উত্তর: প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে পরিধান সামগ্রী বিষয়ে যে পোশাকি দূরত্ব ছিল, বিশ্বায়নের সুবাদে তা ক্রমবিলীয়মান। পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চা মানুষের এই ক্রমপরিবর্তিত ফ্যাশনেরও নথিবদ্ধকরণ করে। এই ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি ভৌগোলিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক অভিরুচি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক রীতি কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছে।

গ. স্থানীয় ইতিহাস বলতে কী বোঝো?

উত্তর: স্থানীয় ইতিহাস (Local History) বলতে আমরা বুঝি স্থানীয় কোনো নির্দিষ্ট জায়গার মানুষের জীবনের ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে সেই ছোটো জায়গায় যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধিত হয় স্থানীয় ইতিহাস তার-ই নথিবদ্ধকরণ (Documentation) করে।

ঘ. ‘Letters from a Father to his Daughter’-এ নেহেরু গল্পের ছলে কোন্ কোন্ বিষয়ের উল্লেখ করেছেন?

উত্তর: জওহরলাল নেহরুর তাঁর মেয়েকে লেখা চিঠিগুচ্ছ—’Letters from a Father to His Daughter’ ইতিহাসচর্চার এক অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। চিঠিগুলোতে দেখানো হয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশের ইতিহাস থেকে মানব ইতিহাস সম্পর্কে কত কিছু জানা যায়। গল্পের ছলে পৃথিবীর সৃষ্টি, প্রাণের আবির্ভাব, মানুষের জন্ম, আগুনের ব্যবহার, ভাষাবৈচিত্র্য, ধর্মের প্রাদুর্ভাব, দলপতি ও রাজার সৃষ্টি, শ্রমের বিভাজন, পুরানো সভ্যতা ও শহর, রামায়ণ-মহাভারতের গল্প ও গুরুত্ব—এই সমস্ত কিছু নিয়েই সহজ ও অথচ বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা রয়েছে চিঠিগুচ্ছটিতে। তিনি ইন্দিরাকে সহজ কথায় বুঝিয়েছেন কীভাবে মানুষের দ্বারা নির্বাচিত দলপতি একসময় রাজা হয়ে যায় এবং বিশ্বাস করতে শুরু করে ‘The State, it is I’ তিনিই রাজা, তিনি রাজত্ব। তিনি ‘How Early History was written’ শীর্ষক চিঠিতে জানান যে সেই সময়ে ভারতবর্ষ হয়তো ছিল পরাধীন এক দেশ। কিন্তু ভারতবর্ষ একসময় সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী দেশ ছিল। তিনি তাঁর ‘The Races and Languages of Mankind’ শীর্ষক চিঠিতে ভারতবর্ষের দ্রাবিড়, আর্য ও মঙ্গোলীয়দের সম্পর্কে আলোচনা করেন। তাঁর লেখা থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষার ব্যবহার সম্বন্ধেও ধারণা তৈরি হয়। ‘The First Living Things’ শীর্ষক চিঠিতে জগদীশচন্দ্র বসুর বিজ্ঞান বিষয়ক কাজের কথা তিনি উল্লেখ করেন। ভারতবর্ষের তৎকালীন সময়ের বিজ্ঞানচর্চা সম্পর্কেও চিঠিটা আমাদের ধারণা দেয়। তিনি তাঁর ‘Different Classes of People’ শীর্ষক চিঠিতে ইতিহাস পাঠ নিয়ে মন্তব্য করেন।

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন

ক. নতুন সামাজিক ইতিহাস কেন ‘অন্যরকম’ ইতিহাস?

উত্তর: নতুন সামাজিক ইতিহাস ‘অন্যরকম’ কারণ এটি সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করে। ইতিহাস বলতেই সাধারণত যা বোঝা হতো—তা বড়ো ঘটনা, বড় মানুষের কথা বলবে—নতুন সামাজিক ইতিহাস সেই ‘বড়ো’ মানুষের (Great man) পরিবর্তে সাধারণ মানুষের (Common man) কথা বলে। সাধারণভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে টপ-ডাউন (Top-down) পদ্ধতি অনুসৃত হয়, অর্থাৎ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তে যে সকল মানুষ আছেন, ইতিহাসচর্চার সূচনা তাদের থেকেই হয়। কিন্তু নতুন সামাজিক ইতিহাস রচনা শুরুই হল সাধারণ মানুষদের নিয়ে, এবং অনুসৃত হল বটম-আপ (Bottom-up) পদ্ধতি। এই চর্চায় মানুষের ‘ইতিহাসে মানুষ ফিরে এল’ (‘History with the people put back in’), যা একে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। মানব ইতিহাসের বিভিন্ন সামাজিক উপাদান যেমন— খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস, পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস, স্থানীয় ইতিহাস, খেলার ইতিহাস, শিল্পচর্চার ইতিহাস—এ সমস্ত কিছুই নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চার পরিধির মধ্যে পড়ে, যা প্রচলিত ইতিহাস চর্চা থেকে ভিন্ন।

খ. টীকা লেখো: চিত্রকলা ও সমসাময়িক সময়।

উত্তর: চিত্রকলা হল দৃশ্য শিল্পের একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই চিত্রকলার চর্চা হয়ে চলেছে। আদিম মানব বিভিন্ন গুহার গায়ে বা দেওয়ালে ছবি আঁকত; ভাষা আবিষ্কারের পূর্বে এই ছবিগুলিই ছিল মানুষের ভাবপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। চিত্রকলার মাধ্যমে শিল্পী সমসাময়িক ভাবনা ও অনুভূতি প্রকাশ করেন। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ-সপ্তদশ শতকের মধ্যে ইতালিতে লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো ও র‍্যাফ্যায়েলের মতো শিল্পীদের হাতে চিত্রকলায় যুগান্তকারী সাফল্য আসে। পরবর্তীকালে শৈল্পিক ভাবনা ও অঙ্কনশৈলীর ওপর নির্ভর করে পৃথিবীতে বিভিন্ন চিত্রাঙ্কন গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে এবং চিত্র ধীরে ধীরে প্রতীকধর্মী হয়ে ওঠে। ভারতবর্ষেও প্রস্তরযুগীয় চিত্রকলা থেকে শুরু করে গুপ্ত যুগের অজন্তা-গুহাচিত্র, মোঘল যুগের চিত্রকলা এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে নব্য ভারতীয় চিত্রকলার ধারা—এ সবই সমসাময়িক সময়ের প্রতিফলন। নন্দলাল বসু এবং তাঁর অনুগামীরা এই ধারাকে বিকশিত করেন। চিত্রকলা সরাসরি মানুষের জীবনচর্চাকে প্রকাশ করে এবং মানুষের ব্যক্তি ও সমাজজীবনের নানা উত্থান-পতন ও বিবর্তনের চলমান আলেখ্য তৈরি করে। ঐতিহাসিকরা চিত্রকলার ইতিহাস চর্চার মধ্য দিয়ে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া শিল্পীর ভাবনা, অঙ্কনশৈলী প্রভৃতি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করেছেন, যা সমসাময়িক সময়কে বুঝতে সাহায্য করে।

গ. ইতিহাসের উপাদান হিসাবে সরকারি নথি, না ব্যক্তিগত চিঠি—কোন্টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে তুমি মনে করো।

উত্তর: ইতিহাস চর্চার উপাদান হিসাবে সরকারি নথিপত্র এবং ব্যক্তিগত চিঠিপত্র উভয়েরই গুরুত্ব অপরিসীম। সরকারি নথিপত্রের মধ্যে সরকারি আধিকারিকদের প্রতিবেদন, গোয়েন্দা বা পুলিশের রিপোর্ট, চিঠিপত্র ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। এগুলি থেকে তদানীন্তন ‘শাসক’দের চিন্তাভাবনা, প্রশাসনিক কাজকর্ম, সরকারি নীতি ও তার উদ্দেশ্য বোঝা যায়, যেমন লর্ড মেকলের ‘মিনিটস্’ বা লর্ড ডালহৌসির রানি ভিক্টোরিয়াকে লেখা চিঠি থেকে বোঝা যায়। তবে, সরকারি নথিতে অনেক সময় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বা বিশেষ উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হতে পারে, যা সবসময় নিরপেক্ষ নাও হতে পারে, যেমন সরকারি সার্কুলারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম সন্দেহভাজন হিসেবে থাকা।

অন্যদিকে, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র সমকালীন সমাজ ও সেই সময়ে মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা জানার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। জওহরলাল নেহরুর তাঁর মেয়ে ইন্দিরাকে লেখা চিঠিগুলি থেকে প্রকৃতি, পরিবেশ, মানব ইতিহাস, সভ্যতা, সমাজ, ধর্ম, এমনকি পরাধীনতার গ্লানি সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনা ও তৎকালীন সময়ের দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায়। এই ধরনের চিঠি ইতিহাসের অনেক ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিক তুলে ধরে যা সরকারি নথিতে পাওয়া যায় না।

সরকারি নথি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ঘটনার কাঠামো বুঝতে সাহায্য করে, আর ব্যক্তিগত চিঠি সমকালীন সমাজ ও ব্যক্তি মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি ও জীবনযাত্রার ছবি তুলে ধরে। কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা নির্ভর করে ঐতিহাসিক কোন বিষয়ের উপর গবেষণা করছেন তার উপর। উভয় প্রকার উপাদানই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে জানতে সাহায্য করে এবং একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।

অতিরিক্ত (Extras)

বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQs)

১. নতুন সামাজিক ইতিহাসের মূল লক্ষ্য কী?

ক. রাজা-মহারাজা
খ. সাধারণ মানুষ
গ. সামন্ত প্রভু
ঘ. উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্ব

উত্তর: খ. সাধারণ মানুষ

২. নতুন সামাজিক ইতিহাসের চর্চা কোন দশক থেকে জনপ্রিয়তা লাভ করে?

ক. ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ
খ. ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ
গ. ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ
ঘ. ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ

উত্তর: গ. ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ

৩. সামাজিক ইতিহাসের প্রভাব বিস্তারে ফরাসি ঐতিহাসিকদের দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকার নাম কী?

ক. দি অ্যানালস্
খ. দ্য হিস্ট্রি
গ. দি রিভিউ
ঘ. দি একাডেমি

উত্তর: ক. দি অ্যানালস্

৪. ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে ভারতের খেলার অংশগ্রহণে প্রধান সমস্যাটি কী ছিল?

ক. বিদেশি মুদ্রার সমস্যা
খ. পায়ে খেলা
গ. খেলাধুলার অভাব
ঘ. খেলার নিয়ম অজানা

উত্তর: খ. পায়ে খেলা

৫. খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস থেকে মানুষের জীবনের কোন দিকটি বোঝা যায়?

ক. খাদ্যের প্রকারভেদ
খ. খাদ্যের পরিমাণ
গ. জীবনযাত্রার বিবর্তন
ঘ. খাদ্য মূল্য

উত্তর: গ. জীবনযাত্রার বিবর্তন

৬. শিল্পচর্চার ইতিহাস মানুষের কোন পরিবর্তনের প্রতিফলন করে?

ক. রাজনৈতিক পরিবর্তন
খ. শিল্পীদের বাণী
গ. ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিবর্তন
ঘ. প্রযুক্তিগত উন্নতি

উত্তর: গ. ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিবর্তন

৭. নাটকের মাধ্যমে কোন শিল্প মাধ্যমটি সমসাময়িক মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে?

ক. চিত্রকলার
খ. ফটোগ্রাফির
গ. নাটকের
ঘ. স্থাপত্যের

উত্তর: গ. নাটকের

৮. বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে কোন পরিচালককে মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়?

ক. সত্যজিৎ রায়
খ. ঋত্বিক ঘটক
গ. মৃণাল সেন
ঘ. মোহনবাগান

উত্তর: ক. সত্যজিৎ রায়

৯. ইংল্যান্ডে প্রথম সফল বাষ্পচালিত রেলওয়ে ইঞ্জিন কোন খ্রিস্টাব্দে চালু হয়?

ক. ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে
খ. ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে
গ. ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে
ঘ. ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে

উত্তর: খ. ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে

১০. রাইট ব্রাদার্সের আবিষ্কৃত কোন যন্ত্র যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যায়?

ক. রেলগাড়ি
খ. বাষ্প ইঞ্জিন
গ. এ্যারোপ্লেন
ঘ. বুলেট ট্রেন

উত্তর: গ. এ্যারোপ্লেন

১১. ফটোগ্রাফির বাণিজ্যিক সূচনার খ্রিস্টাব্দ কোনটি?

ক. ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে
খ. ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে
গ. ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে
ঘ. ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে

উত্তর: গ. ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে

১২. ফটোগ্রাফিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগের সূচনা কোন খ্রিস্টাব্দে হয়েছে?

ক. ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে
খ. ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে
গ. ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে
ঘ. ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে

উত্তর: ক. ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে

১৩. স্থাপত্যের ইতিহাসে প্রাচীন নির্মাণের উদাহরণ হিসেবে প্রধানত কোনটি উল্লেখ করা হয়?

ক. কোলসিয়াম
খ. তাজ মহল
গ. পিরামিড
ঘ. কুতুবমিনার

উত্তর: গ. পিরামিড

১৪. স্থানীয় ইতিহাসে নিম্নলিখিত উপাদানের মধ্যে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে?

ক. সরকারি নথি
খ. মৌখিক ঐতিহ্য
গ. বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট
ঘ. আন্তর্জাতিক সংবাদ

উত্তর: খ. মৌখিক ঐতিহ্য

১৫. শহরের ইতিহাসে প্রধানত কোন উপাদানের বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়?

ক. প্রশাসনিক নথি
খ. খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক
গ. সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবন
ঘ. বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন

উত্তর: গ. সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবন

১৬. সামরিক ইতিহাসে প্রধানত কোন বিষয়ের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়?

ক. অর্থনৈতিক নীতি
খ. সামরিক কৌশল
গ. অস্ত্রের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন
ঘ. সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

উত্তর: গ. অস্ত্রের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন

১৭. পরিবেশের ইতিহাসে কোন ঘটনা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়?

ক. পরিবেশ দূষণ
খ. হিরোসিমা ও নাগাসাকির বোমা
গ. বন্যপ্রাণীর হ্রাস
ঘ. জলবায়ু পরিবর্তন

উত্তর: খ. হিরোসিমা ও নাগাসাকির বোমা

১৮. বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাস কী প্রদর্শন করে?

ক. শুধুমাত্র চিকিৎসা উন্নতি
খ. মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন
গ. শিল্পের বিবর্তন
ঘ. রাজনৈতিক পরিবর্তন

উত্তর: খ. মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন

১৯. নারী ইতিহাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কোন আন্দোলন প্রভাব ফেলেছে?

ক. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
খ. নারী স্বাধীনতা আন্দোলন
গ. উইমেন্স লিবারেশন মুভমেন্ট
ঘ. রাজনৈতিক বিপ্লব

উত্তর: গ. উইমেন্স লিবারেশন মুভমেন্ট

২০. মালালা ইউসুফজাই কোন দেশের তরুণী?

ক. ভারত
খ. পাকিস্তান
গ. বাংলাদেশ
ঘ. নেপাল

উত্তর: খ. পাকিস্তান

২১. মালালা ইউসুফজাই কোন খ্রিস্টাব্দে বুলেট-বিদ্ধ হন?

ক. ২০১০ খ্রিস্টাব্দ
খ. ২০১১ খ্রিস্টাব্দ
গ. ২০১২ খ্রিস্টাব্দ
ঘ. ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ

উত্তর: গ. ২০১২ খ্রিস্টাব্দ

২২. মালালা ইউসুফজাই নোবেল পুরস্কার কোন খ্রিস্টাব্দে গ্রহণ করেন?

ক. ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ
খ. ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ
গ. ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ
ঘ. ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ

উত্তর: খ. ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ

২৩. ইতিহাসচর্চায় সরকারি নথিপত্র প্রধানত কোন তথ্য প্রদান করে?

ক. ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
খ. প্রশাসনিক কাজকর্ম
গ. সাহিত্যিক সমালোচনা
ঘ. সামাজিক স্মৃতি

উত্তর: খ. প্রশাসনিক কাজকর্ম

২৪. ‘মেকলে মিনিটস্’-এ প্রধানত কোন বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে?

ক. রাজনীতি
খ. অর্থনীতি
গ. শিক্ষা
ঘ. সংস্কৃতি

উত্তর: গ. শিক্ষা

২৫. আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা ইতিহাসের কোন উপাদানকে তুলে ধরে?

ক. ব্যক্তিগত অনুভূতি
খ. বৈজ্ঞানিক তথ্য
গ. প্রশাসনিক নথি
ঘ. চিঠিপত্র

উত্তর: ক. ব্যক্তিগত অনুভূতি

২৬. জওহরলাল নেহরুর চিঠিগুলির মাধ্যমে প্রধানত কোন বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়?

ক.আন্তর্জাতিক ক্রীড়া
খ.স্বাধীনতা সংগ্রাম
গ.বিজ্ঞান গবেষণা
ঘ.শিল্পচর্চা

উত্তর: খ. স্বাধীনতা সংগ্রাম

২৭. সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্র ইতিহাসের কোন উপাদানকে প্রকাশ করে?

ক. প্রশাসনিক কাজ
খ. প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন
গ. সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি
ঘ. ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

উত্তর: গ. সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি

২৮. ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার মাধ্যমে প্রধানত কোন প্রভাব বিস্তার করা হয়েছিল?

ক. অর্থনৈতিক উন্নতি
খ. নবজাগরণ
গ. বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার
ঘ. সাংস্কৃতিক সংস্কার

উত্তর: খ. নবজাগরণ

২৯. ইতিহাসচর্চায় উপাদানগুলির মধ্যে কোনটি সাধারণত প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কম পাওয়া যায়?

ক. সরকারি নথিপত্র
খ. মৌখিক তথ্য
গ. প্রামাণ্য দলিল
ঘ. সংবাদপত্র

উত্তর: গ. প্রামাণ্য দলিল

৩০. বিপিনচন্দ্র পালের ‘সত্তর বৎসর’ গ্রন্থে কোন বিষয়ের প্রতিফলন পাওয়া যায়?

ক. রাজনৈতিক নীতি
খ. সামরিক ইতিহাস
গ. ব্যক্তিগত ও সামাজিক ইতিহাস
ঘ. সাহিত্যিক সমালোচনা

উত্তর: গ. ব্যক্তিগত ও সামাজিক ইতিহাস

৩১. সরলাদেবী চৌধুরানীর ‘জীবনের ঝরাপাতা’ গ্রন্থে প্রধানত কোন সংগ্রামের দিক তুলে ধরা হয়েছে?

ক. শিক্ষা সংগ্রাম
খ. শিল্প সংগ্রাম
গ. স্বাধীনতা সংগ্রাম
ঘ. বিজ্ঞান সংগ্রাম

উত্তর: গ. স্বাধীনতা সংগ্রাম

৩২. ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রধান অসুবিধা কী?

ক. তথ্যের দ্রুততা
খ. তথ্যের সঠিকতা
গ. তথ্যের পরিমাণ
ঘ. তথ্যের গোপনীয়তা

উত্তর: খ. তথ্যের সঠিকতা

৩৩. ইতিহাসচর্চায় ব্যবহৃত উপাদানগুলির মধ্যে কোনটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন করে?

ক. সরকারি নথিপত্র
খ. সাময়িকপত্র
গ. আত্মজীবনী
ঘ. রিপোর্ট

উত্তর: গ. আত্মজীবনী

৩৪. আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায় ‘চিঠিপত্র’ উপাদানের মাধ্যমে মূলত কোন বিষয় প্রকাশ পায়?

ক. প্রশাসনিক নথি
খ. রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
গ. ব্যক্তিগত অনুভূতি
ঘ. আর্থিক হিসাব

উত্তর: গ. ব্যক্তিগত অনুভূতি

৩৫. ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা প্রধানত কোন বিষয়ে প্রতিবাদ প্রকাশের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজকে চেতনা প্রদান করে?

ক. ইংরেজ শাসন
খ. শিল্প সংস্কৃতি
গ. বৈজ্ঞানিক উন্নতি
ঘ. খেলাধুলা

উত্তর: ক. ইংরেজ শাসন

৩৬. প্রথম দীর্ঘস্থায়ী রঙিন ছবি তোলার ক্ষেত্রে প্রণোদনা কোন খ্রিস্টাব্দে হয়েছিল?

ক. ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দ
খ. ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ
গ. ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ
ঘ. ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দ

উত্তর: গ. ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ

৩৭. প্রাথমিক মানবের চিত্রকলার প্রধান মাধ্যম হিসেবে কোনটি ব্যবহৃত হত?

ক. কাগজে আঁকা ছবি
খ. দেওয়ালে আঁকা ছবি
গ. ক্যানভাসে আঁকা ছবি
ঘ. ডিজিটাল ছবি

উত্তর: খ. দেওয়ালে আঁকা ছবি

প্রশ্ন ও উত্তর (Questions, Answers)

1: নতুন সামাজিক ইতিহাস বলতে কী বোঝানো হয়?

উত্তর: নতুন সামাজিক ইতিহাস আসলে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনের ইতিহাস। এই ইতিহাস ‘বড়ো’ মানুষের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের কথা বলে।

2. “দি অ্যানালস” কী এবং কে এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?

উত্তর: দি অ্যানালস্ (The Annales) একটি পত্রিকা। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে মার্ক ব্লখ ও লুসিয়েন ফেভর এটি প্রকাশ করেন।

3. টপ-ডাউন ইতিহাসচর্চা বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: সাধারণভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে টপ-ডাউন (Top-down) পদ্ধতি অনুসৃত হয়। অর্থাৎ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তে যে সকল মানুষ আছেন, ইতিহাসচর্চার সূচনা তাদের থেকেই হয়, তাকে টপ-ডাউন ইতিহাসচর্চা বোঝায়।

4. বটম-আপ ইতিহাসচর্চা কী?

উত্তর: নতুন সামাজিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বটম-আপ (Bottom-up) পদ্ধতি অনুসৃত হয়, যা সাধারণ মানুষদের নিয়ে শুরু হয়।

5. কোন দেশের ঐতিহাসিক জি. এম. ট্রেভেলিয়ান?

উত্তর: জি. এম. ট্রেভেলিয়ান একজন ইংরেজ ঐতিহাসিক।

6. খেলার ইতিহাসের মাধ্যমে কী জানা যায়?

উত্তর: খেলাধূলার ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে সমাজের পটপরিবর্তন ও খেলাধূলার নিজস্ব বিবর্তনের কথা জানা যায়। খেলাধূলার ইতিহাস চর্চার বৈশিষ্ট্যই এই যে, তা মানুষের ক্ষমতার ব্যক্তিগত, সমষ্টিগত পরিবর্তন ও বিবর্তন অতি সহজেই চিহ্নিত করে। এই ইতিহাস চর্চায় প্রতিফলিত হয় মানবজাতির সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত নানা ভাবনা বিশ্বাস ও সংস্কার। খেলাধূলার আইন কানুনের পরিবর্তিত নানা ভাবনা বিশ্বাস ও সংস্কার, খেলাধূলার আইনকানুনের পরিবর্তন ও আসলে যে বিবর্তিত মানবজাতির সময় আলেখ্য তৈরি করে, তা খেলাধূলার ইতিহাস চর্চার মাধ্যমেই বোঝা যায়।

7. বিশ্বকাপ ফুটবলে ভারত কেন অংশগ্রহণ করতে পারেনি?

উত্তর: ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় ভারতের খেলার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু ভারতীয়রা খালি পায়ে খেলত, বুট পরে খেলত না। সেই কারণে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সম্পর্কিত সমস্যার কারণে ভারতের পক্ষে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

8. মোহনবাগান কোন বিদেশি দলকে হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জিতেছিল এবং কবে?

উত্তর: ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে মোহনবাগান প্রথম ভারতীয় দল হিসাবে একটি বিদেশি দল, ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারিয়ে আই. এফ. এ শিল্ড জিতেছিল।

9: শিল্পচর্চার ইতিহাস কাদের সামাজিক বিবর্তনের কথা বলে?

উত্তর: শিল্পচর্চার ইতিহাস মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক–দুই ধরনের বিবর্তনেরই উল্লেখ করে ও বিশ্লেষণের সুযোগ করে দেয়।

10: আধুনিক ফটোগ্রাফির সূচনা কবে ও কে করেন?

উত্তর: ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ থমাস ওয়েজউড প্রথম ক্যামেরার মাধ্যমে ছবি তোলার চেষ্টা করেন। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে নিসেফোঁ নেপস-এর প্রচেষ্টাও উল্লেখযোগ্য। এরপর নেপস-এর পরিচিত লুইস ডগার মসৃণভাবে ফটো তুলতে সমর্থ হন। ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে বাণিজ্যিকভাবে ফটোগ্রাফির সূচনা হয়।

11: বাষ্পচালিত রেলওয়ের যাত্রা কবে শুরু হয়?

উত্তর: ইংল্যান্ডে প্রথম সফল বাষ্পচালিত রেলওয়ে ইঞ্জিন চলতে শুরু করে ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে।

12: পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব কী?

উত্তর: পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসের মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন ও রুচির পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চা মানুষের ক্রমপরিবর্তিত ফ্যাশনেরও নথিবদ্ধকরণ করে। এই ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে বোঝা যায় ভৌগোলিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক অভিরুচি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক রীতি কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছে।

13: ভারতবর্ষে নব্য ভারতীয় চিত্রকলার সূচনা কার নেতৃত্বে হয়েছিল?

উত্তর: ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে অবনীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে নব্য ভারতীয় চিত্রকলার এক নতুন ধারা সূচিত হয়।

14: প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফটোগ্রাফির সূচনা কোন সালে হয়?

উত্তর: ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে বাণিজ্যিকভাবে ফটোগ্রাফির সূচনা হয়।

15: ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা কারা ছিলেন?

উত্তর: বাংলায় ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে হীরালাল সেন ও মোতিলাল সেন রয়‍্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি তৈরি করেন। হীরালাল সেন বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলন বিষয়ক একটি তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেন, যা তাঁদের ভারতের প্রথমদিকের চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নির্দেশ করে।

16: সামাজিক ইতিহাসের দুটি পর্ব কী কী?

উত্তর: সামাজিক ইতিহাস মূলত দুটি পর্বে বিভক্ত। পর্ব দুটি হলো পুরানো সামাজিক ইতিহাস (Old Social History) এবং নতুন সামাজিক ইতিহাস (New Social History), যা ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত হয়।

17: নতুন সামাজিক ইতিহাসে কোন ধরনের মানুষের ইতিহাস বেশি গুরুত্ব পায়?

উত্তর: নতুন সামাজিক ইতিহাস ‘বড়ো’ মানুষের (Great man) পরিবর্তে সাধারণ মানুষের (Common man) কথা বলে, অর্থাৎ সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনের ইতিহাসই নতুন সামাজিক ইতিহাসে বেশি গুরুত্ব পায়।

18: মানব ইতিহাসের বিভিন্ন সামাজিক উপাদানের মধ্যে যেকোনো দুটি উল্লেখ করো।

উত্তর: মানব ইতিহাসের বিভিন্ন সামাজিক উপাদানের মধ্যে দুটি হলো:
১. খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস
২. পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস

19. প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক খেলার আবির্ভাবের কারণ কী ছিল?

উত্তর: মানবসভ্যতার একেবারে শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক খেলার উপস্থিতি ছিল। প্রতিকূল পরিবেশকে নিজের অনুকূলে আনার জন্য মানুষকে নানা বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছে। জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে দেহকে শক্তিশালী করতে হত। তাই মানুষ পরস্পরের সঙ্গে নানা শারীরিক অনুশীলন করত। বিভিন্ন প্রকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক খেলা এসব চর্চারই ফল।

20. খেলাধুলার ইতিহাসে মহিলা প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?

উত্তর: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলাধুলায় মহিলা প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে—খেলোয়াড় ও দর্শক দুই হিসাবেই। খেলার জগতে মহিলাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক বাঁক হিসাবে উল্লেখ্য।

21. খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস কীভাবে মানুষের জীবনযাত্রার বিবর্তন নির্দেশ করে?

উত্তর: খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস চর্চা মানুষের সামাজিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। খাদ্য মানুষের একটি প্রাথমিক চাহিদা। সময়ের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আসলে মানুষের জীবনযাত্রার বিবর্তনের কথাও বলে।

22. ফটোগ্রাফ ইতিহাস চর্চায় কীভাবে ব্যবহৃত হয়?

উত্তর: আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে ফটোগ্রাফ একটি প্রয়োজনীয় উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণের জন্য ফটোগ্রাফগুলি প্রামাণ্য দলিল হিসাবে কাজ করে। অনেক সময় দুটি ঘটনার তুলনামূলক আলোচনার জন্য ফটোগ্রাফ ব্যবহার করা হয়। বহু আগে তোলা কোনো শহরের রাস্তাঘাটের ছবি ও সমসাময়িক সময়ে তোলা একই জায়গার ছবি – এই দুটির মধ্যে তুলনা করলে সময়ের সঙ্গে স্থাপত্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদির ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন এসেছে তা সহজেই বোঝা যায়। বহু ক্ষেত্রে এমন অনেক বিষয়বস্তু আছে যা বলে বা লিখে বোঝানো যায় না, কিন্তু ছবির মাধ্যমে অনেক সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। তবে ফটোগ্রাফ যেহেতু যিনি ছবি তুলছেন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে, তাই ইতিহাসের উপাদান হিসাবে ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত, কারণ ফটোগ্রাফি হয়তো সবসময় ঘটনার নৈর্ব্যক্তিক বা পক্ষপাতহীন প্রকাশ হয়ে ওঠে না।

23: নাটকের মাধ্যমে কীভাবে সমসাময়িক সমাজের চিত্র প্রকাশিত হয়?

উত্তর: নাটকের মাধ্যমে নাট্যকার ও শিল্পী সমসাময়িক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং দর্শকের উপস্থিতি ও তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার কারণে নাটক একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যম। সমাজ, সময়, নাট্যচর্চা ও ইতিহাস কখনোই দূরত্বের সম্পর্কে অবস্থান করে না; লেখাতে সমসাময়িক চিত্র ফুটে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ বা সমরেশ বসুর লেখা অবলম্বনে রচিত ‘ছেঁড়া তমসুক’-এ সেই সময়ের বিভেদ, বন্ধুত্ব ও অবিশ্বাসের চিত্র ফুটে উঠেছে। পোশাক, অলংকার, প্রসাধন ও গান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নাটকগুলিতে সমসাময়িকতার চিত্র ফুটে উঠতে দেখা যায়। নাট্য চর্চার এই বিভিন্ন দিক এবং তার সঙ্গে বিবর্তিত নাটকের ইতিহাস বহু ঐতিহাসিকদের ইতিহাস চর্চার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।

24: স্থানীয় ইতিহাসের উপাদান হিসেবে দুটি উদাহরণ দাও।

উত্তর: স্থানীয় ইতিহাসের উপাদান হিসেবে দুটি উদাহরণ হল:
১. বহু পুরোনো মন্দির, মসজিদ, চার্চ, পুরোনো বাড়ি, এমনকি পুরোনো কোনো গাছ।
২. কোনো পুরোনো বাড়িতে ঘটে যাওয়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা কোনো গাছের সঙ্গে জড়িত কোনো দেশপ্রেমিক লড়াইয়ের কাহিনি।

25: নারী ইতিহাস রচনার গুরুত্ব কখন স্পষ্টভাবে সামনে আসে এবং এর প্রধান কারণ কী?

উত্তর: নারী ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রটি ১৯৭০-৮০ খ্রিস্টাব্দে গতি পায়, যদিও এর প্রাসঙ্গিকতা তার অনেক আগেই অনুভূত হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে ‘উইমেন্স লিবারেশন মুভমেন্ট’ বা ‘সেকেন্ড ওয়েভ ফেমিনিজম্’ নারী ইতিহাস রচনার প্রয়োজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে। এর প্রধান কারণ হল, ইতিহাসের বিভিন্ন প্রামাণ্য পুস্তকে নারীর ভূমিকা মূলত অবহেলিত ছিল এবং নারীর যেকোনো কাজকে ব্যতিক্রম হিসাবে দেখা হত, যা মানবসভ্যতার যাত্রাপথে নারীর সক্রিয় ভূমিকার কথা তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে। বহু ক্ষেত্রে নারীবাদ (Feminism) নারী ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রটিকে শক্তিশালী করেছে।

26: নতুন সামাজিক ইতিহাস ও পুরাতন সামাজিক ইতিহাসের পার্থক্য আলোচনা করো।

উত্তর: সামাজিক ইতিহাস মূলত দুটি পর্বে বিভক্ত; পুরানো সামাজিক ইতিহাস (Old Social History) এবং ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী নতুন সামাজিক ইতিহাস (New Social History)। ইতিহাস বলতে সাধারণত যা বোঝায় তা হল বড় ঘটনা বা বড় মানুষদের কথা। কিন্তু নতুন সামাজিক ইতিহাস ‘বড়ো’ মানুষ (Great man) এর পরিবর্তে সাধারণ মানুষের (Common man) কথা বলে।

সাধারণভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে উপর থেকে নীচে (Top-down) পদ্ধতি অনুসৃত হয়, অর্থাৎ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের থেকেই ইতিহাসচর্চার সূচনা হয়। কিন্তু নতুন সামাজিক ইতিহাস রচনা শুরু হয় সাধারণ মানুষদের নিয়ে, যেখানে নীচ থেকে উপরে (Bottom-up) পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এই নতুন ধারা অনুযায়ী, ‘ইতিহাসে মানুষ ফিরে এল’ (‘History with the people put back in’)। নতুন সামাজিক ইতিহাস শুধুমাত্র কিছু তথ্যের সম্ভার নয়, বরং সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা সাধারণ মানুষের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তার চর্চা করে।

27: খেলাধুলার ইতিহাসের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

উত্তর: খেলাধূলার ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে সমাজের পটপরিবর্তন এবং খেলাধূলার নিজস্ব বিবর্তনের কথা জানা যায়। এর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এটি মানুষের ক্ষমতার ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত পরিবর্তন এবং বিবর্তনকে সহজেই চিহ্নিত করে। এই ইতিহাস চর্চায় মানবজাতির সময়ের সাথে পরিবর্তিত নানা ভাবনা, বিশ্বাস ও সংস্কার প্রতিফলিত হয়।

খেলাধূলার আইনকানুনের পরিবর্তন আসলে বিবর্তিত মানবজাতির সময়েরই একটি আলেখ্য তৈরি করে, যা খেলাধূলার ইতিহাসের মাধ্যমেই বোঝা যায়। যেমন, ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে মোহনবাগানের আই. এফ. এ. শিল্ড জয় শুধুমাত্র দুটি দলের হার-জিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি পরাধীন দেশের মানুষের মনে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে জমে থাকা বারুদের ইঙ্গিত দিয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে খেলাধুলায় মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব খেলোয়াড় ও দর্শক উভয় হিসাবেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক দিক।

28: খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসের মাধ্যমে সমাজের কোন কোন দিক প্রতিফলিত হয়?

উত্তর: খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসচর্চা মানুষের চাহিদা, রুচি, সংস্কৃতি ইত্যাদির সময়ানুযায়ী নতুন ধারার সন্ধান দেয়। এটি সমাজের সামগ্রিক পটপরিবর্তনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগ কীভাবে মানুষের খাদ্যাভ্যাসকে প্রভাবিত করে, সেই বিষয়েও দিকনির্দেশ করে। এছাড়াও, সময়ের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন কীভাবে মানুষের জীবনযাত্রার বিবর্তনকে প্রতিফলিত করে, তাও খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে বোঝা যায়।

29: শিল্পচর্চার ইতিহাসের মাধ্যমে কীভাবে মানবসমাজের বিবর্তন বুঝতে পারা যায়?

উত্তর: শিল্পচর্চা মানুষের নান্দনিকতার প্রকাশ মাধ্যম এবং এর ইতিহাস পরিবর্তিত সময়ের মানুষের মননের পরিবর্তনের সুস্পষ্ট দিক নির্দেশ করে। সঙ্গীত, নৃত্যনাটক, চলচ্চিত্র বা অন্য যে কোনো শিল্পচর্চার ইতিহাস মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক – দুই ধরনের বিবর্তনেরই উল্লেখ করে এবং তা বিশ্লেষণের সুযোগ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, সঙ্গীতের ব্যবহার বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে কাজ করেছে, নাটক সমসাময়িক সমাজ ও সময়কে প্রতিফলিত করেছে, এবং চলচ্চিত্র সামাজিক পটপরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছে। এইভাবে শিল্পচর্চার ইতিহাস আসলে জীবনচর্চার ইতিহাস হয়ে ওঠে, যার মাধ্যমে মানবসমাজের বিবর্তন বোঝা যায়।

30: পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস থেকে মানবসভ্যতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন কীভাবে জানা যায়?

উত্তর: পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসের মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন ও রুচির পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। সভ্যতার শুরুতে পোশাক ছিল একটি প্রাথমিক প্রয়োজন, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে পোশাক আর শুধুমাত্র লজ্জা নিবারণের উপায় নয়, মানুষের পরিবর্তিত ফ্যাশনের আয়নাও বটে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে পরিধান সামগ্রী বিষয়ে যে পোশাকি দূরত্ব ছিল, বিশ্বায়নের সুবাদে তাও ক্রমবিলীয়মান। পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চা মানুষের এই ক্রমপরিবর্তিত ফ্যাশনেরও নথিবদ্ধকরণ করে। এই ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে ভৌগোলিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক অভিরুচি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক রীতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছে। পোশাক পরিচ্ছদের ইতিহাস চর্চার মধ্য দিয়ে উঠে আসে কীভাবে পোশাক পরিচ্ছদের ইতিহাস পরিবর্তিত সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক সামাজিক ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

31: যানবাহন-যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য ধাপগুলো আলোচনা করো।

উত্তর: যানবাহন-যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য ধাপগুলো হল: একেবারে শুরুর দিকে মানুষ হেঁটে বা দৌড়ে যাতায়াত করত এবং জিনিসপত্র কাঁধে বা কোলে বহন করত অথবা টেনে নিয়ে যেত। ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ মানুষ চাকা আবিষ্কার করে (সম্ভবত মেসোপটেমিয়ায়)। ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইজিপ্টের লোকেরা ভাসমান নৌকা আবিষ্কার করে। এরপর একে একে আসে গোরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি। স্টিম ইঞ্জিনের আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়; ইংল্যান্ডে প্রথম সফল বাষ্পচালিত রেলওয়ে ইঞ্জিন ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে চলতে শুরু করে এবং ১৮৮০ দশকে ইলেকট্রিক ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়, যা রেলপথ যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর সূচনায় (১৯০৩ খ্রি.) রাইট ব্রাদার্স এরোপ্লেন আবিষ্কার করলে যোগাযোগের ধারণাটাই মুহূর্তে বদলে যায় এবং জল, স্থল ও আকাশে মানুষের কর্তৃত্ব কায়েম হয়। পরবর্তীকালে স্পিড বোট, জাহাজ, মোটরযান, দূরপাল্লার বাস, ঘণ্টায় তিনশো কিলোমিটারের বেশি গতিবেগসম্পন্ন বুলেট ট্রেন, পাতাল রেল, দ্রুতগামী হেলিকপ্টার থেকে অতিকায় এয়ারবাস ইত্যাদি আবিষ্কার যোগাযোগ ব্যবস্থার পটপরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়।

32: সামাজিক ইতিহাসের ধারণা ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো এবং এর প্রকারভেদগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: নতুন সামাজিক ইতিহাস আসলে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনের ইতিহাস। প্রবহমান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও তার পরিপার্শ্বের বদলে যাওয়ার ইতিবৃত্ত লেখা থাকে নতুন সামাজিক ইতিহাসের পাতায়। ইংরেজ ঐতিহাসিক জি. এম. ট্রেভেলিয়ান-এর মতে, সামাজিক ইতিহাসকে বাদ দিয়ে যেমন অর্থনৈতিক ইতিহাসের চর্চা সম্ভব নয়, তেমনি রাজনৈতিক ইতিহাসের চর্চাও মূল্যহীন।

ইতিহাস বলতেই আমরা সাধারণত ভাবি যে-তা বড়ো ঘটনা, বড় মানুষের কথা বলবে। কিন্তু নতুন সামাজিক ইতিহাস ‘বড়ো’ মানুষের (Great man) পরিবর্তে সাধারণ মানুষের (Common man) কথা বলে। এটি শুধুমাত্র কিছু তথ্যের সম্ভার নয়, বরং সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা সাধারণ মানুষের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তার-ই চর্চা করে। সাধারণভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে টপ-ডাউন (Top-down) পদ্ধতি অনুসৃত হয়, যেখানে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তে থাকা মানুষদের থেকেই ইতিহাসচর্চার সূচনা হয়। কিন্তু নতুন সামাজিক ইতিহাস রচনা শুরুই হল সাধারণ মানুষদের নিয়ে, এবং এতে বটম-আপ (Bottom-up) পদ্ধতি অনুসৃত হয়। মানুষের ‘ইতিহাসে মানুষ ফিরে এল’ (‘History with the people put back in’)—এই কারণে নতুন সামাজিক ইতিহাসের চর্চা এত বেশি প্রাসঙ্গিক। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা প্রভৃতি দেশে নতুন সামাজিক ইতিহাসের চর্চা জনপ্রিয়তা লাভ করে। ফ্রান্সে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে মার্ক ব্লখ ও লুসিয়েন ফেভর প্রবর্তিত ‘দি অ্যানালস্’ পত্রিকাও ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ইতিহাসচর্চাকে প্রভাবিত করেছিল।

সামাজিক ইতিহাস মূলত দুটি পর্বে বিভক্ত: পুরানো সামাজিক ইতিহাস (Old Social History) এবং ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী কালের নতুন সামাজিক ইতিহাস (New Social History)। মানব ইতিহাসের বিভিন্ন সামাজিক উপাদান যেমন— খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস, পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস, স্থানীয় ইতিহাস, খেলার ইতিহাস, শিল্পচর্চার ইতিহাস—এই সমস্ত কিছুই নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চার পরিধির মধ্যে পড়ে।

33. শিল্পচর্চার ইতিহাসের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করো। এই ইতিহাস মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের বিবর্তনের ক্ষেত্রে কীভাবে ভূমিকা পালন করে?

উত্তর: শিল্পচর্চা মানুষের নান্দনিকতার প্রকাশ মাধ্যম। তাই শিল্পচর্চার ইতিহাস পরিবর্তিত সময়ের মানুষের মননের পরিবর্তনেরও সুস্পষ্ট দিক নির্দেশ করে। সঙ্গীত, নৃত্যনাটক, চলচ্চিত্র বা অন্য যে-কোনো শিল্পচর্চার ইতিহাস মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক—দুই ধরনের বিবর্তনেরই উল্লেখ করে ও বিশ্লেষণের সুযোগ করে দেয়। শিল্পচর্চার ইতিহাস তাই আসলে জীবনচর্চার ইতিহাসও বটে।

এই ইতিহাস মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের বিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেকোনো শিল্পচর্চার ইতিহাস, যেমন সঙ্গীত, নৃত্যনাটক বা চলচ্চিত্র, মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক, এই দুই ধরনের বিবর্তনের উল্লেখ করে এবং তা বিশ্লেষণের সুযোগ করে দেয়। পরিবর্তিত সময়ের সাথে সাথে মানুষের মননের যে পরিবর্তন ঘটে, শিল্পচর্চার ইতিহাস সেই পরিবর্তনেরও সুস্পষ্ট দিক নির্দেশ করে। এভাবেই শিল্পচর্চার ইতিহাস মানুষের জীবনচর্চার বিবর্তনকে প্রতিফলিত করে।

34: চলচ্চিত্রের ইতিহাস কেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিস্তারিত ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: চলচ্চিত্র মানুষের বয়ে চলা ইতিহাসের এক শৈল্পিক দর্পণের মতো কাজ করে। সমস্ত চলচ্চিত্রের মধ্যেই সমসাময়িক সামাজিক পটপরিবর্তনের আঁকিবুকি ফুটে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, হলিউড নির্মিত বেনহার বা সত্যজিৎ রায় নির্মিত জলসাঘর, অথবা ঋত্বিক ঘটক নির্মিত ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’-র মতো সিনেমাগুলিতে দেশভাগের যন্ত্রণার মতো সামাজিক বিষয়গুলি জীবন্ত আখ্যান হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

যেহেতু বহু মানুষের জীবিকা হিন্দি, বাংলা, দক্ষিণী বা অন্যান্য প্রাদেশিক চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে নানাভাবে যুক্ত, তাই ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্পের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই কারণে চলচ্চিত্রের ইতিহাস কখন অজান্তে মানুষের ইতিহাসের চালচিত্র হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সঙ্গে সামাজিক অর্থনৈতিক তথা মানব ইতিহাসের সম্পর্কের কথা ক্রিস্টিন থমসন, ডেভিড বর্ডওয়েল প্রমুখ ঐতিহাসিকদের ইতিহাসচর্চায় বিশেষ প্রাধান্য লাভ করেছে।

35: পরিবেশের ইতিহাস কেন সমসাময়িক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ? মানুষের কর্মকাণ্ড কীভাবে পরিবেশের ইতিহাসের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে?

উত্তর: পরিবেশের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রটি অত্যন্ত সমসাময়িক, কারণ মানুষ ও পরিবেশের মধ্যে যে মিথোজীবিতার সম্পর্ক তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কারণেই প্রশ্নচিহ্নের মুখে। সেজন্যই পরিবেশের ইতিহাস বিষয়টি ১৯৭০-এর পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশগুলিতে ইতিহাসচর্চার একটি অন্যতম শাখা হিসাবে গুরুত্বলাভ করেছে। পরিবেশের ইতিহাস মানুষকে এই প্রশ্নচিহ্নের সামনেও দাঁড় করায় যে মানবসভ্যতা ক্রমে স্বতঃপ্রণোদিত ক্ষয় ও ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে না তো? একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় পরিবেশের ইতিহাস শুধুমাত্র মানুষের বাহ্যিকভাবে বেড়ে ওঠার কথাই বলে না, মানব-প্রকৃতিও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই মানব-প্রকৃতির দূষণও (যেমন হিরোসিমা-নাগাসাকিতে বোমা বর্ষণ) পরিবেশের ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। সে কারণেই পরিবেশের ইতিহাস তার বিস্তৃতি ও গভীরতার ভিত্তিতে এত বেশি করে সমসাময়িক।

মানুষের কর্মকাণ্ড পরিবেশের ইতিহাসের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে কারণ প্রযুক্তির হাত ধরে মানুষ সভ্যতার নানা ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটালেও, নানা ক্ষেত্রে প্রযুক্তিবিজ্ঞানের অতি ব্যবহার ও ত্রুটিযুক্ত ব্যবহার পরিবেশ-পরিস্থিতি সংকটময় করে তুলেছে। আধুনিক সময়ের অন্যতম সমস্যা হল বিশ্ব-উষ্ণায়ন, যার ফলে গ্রিন হাউস গ্যাসের প্রভাবে পরিবেশের তাপমাত্রা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে, মেরুপ্রদেশের বরফ গলে যাচ্ছে ও উপকূলবর্তী শহরগুলি নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে। তাই পরিবেশের ইতিহাস শুধুমাত্র উন্নতির ইতিহাস নয়। মানুষের নানা কর্মকাণ্ড, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে বোমা নিক্ষেপ করে শহর নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, সেই বোমা বর্ষণের দিন-তারিখ-স্থানের সঙ্গে সঙ্গে মানব-প্রকৃতির দূষণ হিসেবে পরিবেশের ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। ক্রিস্টোফার স্মাউট বা উইলিয়ম ক্রনন প্রমুখ ঐতিহাসিকরা পরিবেশের ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে মানবসভ্যতা ও পরিবেশের সম্পর্কের পরিবর্তনশীল রূপটির কালানুক্রমিক নথিবদ্ধকরণ করেন, যা মূলত মানুষের কার্যকলাপের প্রভাবকেই অন্তর্ভুক্ত করে।

36: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসকে মানুষের জীবনজয়ের ইতিহাস বলা হয়েছে কেন? উদাহরণসহ আলোচনা করো।

উত্তর: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাস (History of Science-Technology and Medicine) আসলে মানুষের জীবনজয়ের ইতিহাস। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ তার কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে জয় করার চেষ্টা করেছে। সময়ের সঙ্গে এই প্রকৃতি-জয়ের পদ্ধতি-প্রকরণে পার্থক্য এসেছে। মানুষ সরল যন্ত্র থেকে জটিলতর যন্ত্র আবিষ্কার করেছে। তীব্রগতির যানবাহন মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেয় অতি অল্প সময়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানেও সময়ের সঙ্গে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছে। শহরাঞ্চল তো বটেই, গ্রামের মানুষের জীবনও চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে অনেক সুরক্ষিত হয়েছে। অনেক উন্নতমানের ওষুধের আবিষ্কার হয়েছে। শল্যচিকিৎসার ক্ষেত্রেও অভাবনীয় সাফল্য লাভ করা গিয়েছে। যে সমস্ত ‘অপারেশন’-এর পর রোগীকে দীর্ঘকাল বিছানায় বিশ্রাম নিতে হত, মাইক্রোসার্জারির কল্যাণে সেই মানুষরা দু-দিনেই তাদের সক্রিয় জীবনে অংশগ্রহণ করতে পারছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবন বদলে যাওয়ার ইতিহাস।

37 . প্রশ্ন: আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার মাধ্যমে সমকালীন সমাজ ও রাজনৈতিক ইতিহাসকে কীভাবে বুঝতে সাহায্য করে, উদাহরণসহ আলোচনা করো।

উত্তর: ঐতিহাসিক উপাদান হিসাবে আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার গুরুত্ব অপরিসীম। এই ধরনের লিখিত উপাদানে লেখকের সমসাময়িক রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের নানা কথার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উল্লেখ থাকে। সেই আত্মজীবনী যখন হয় কোনো স্বাধীনতা সংগ্রামীর, তখন তা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জীবন্ত আলেখ্য হয়ে উঠবে, একথা বলাই বাহুল্য। মহাত্মা গান্ধির লেখা ‘দ্যা স্টোরি অফ মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ’ বা জওয়াহরলাল নেহরুর ‘অ্যান অটোবায়োগ্রাফি (টু ওয়ার্ড ফ্রিডম) প্রভৃতি আত্মজীবনীর মধ্যে তৎকালীন সমাজ, রাজনীতি ও মানবজীবন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাই।

বিপিনচন্দ্র পাল তাঁর আত্মজীবনী ‘সত্তর বৎসর’-এ নিজের জীবনের সত্তর বছরের ইতিহাসকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। ভূমিকাতে লিখেছেন, ‘আমার সত্তর বৎসরের জীবনকথা বাস্তবিক এই বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসেরই কথা, আমার ক্ষুদ্র জীবন বাংলার এই সত্তর বৎসরের সমাজজীবনের সঙ্গে কাপড়ের টানা ও পোড়েনের সূতার মতন জড়াইয়া আছে।’ যে সমস্ত মানুষের ত্যাগ ও প্রচেষ্টায় ভারতবর্ষ এক নতুন রূপ লাভ করেছে, তাঁদের কথা লেখক তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, নবগোপাল মিত্র, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, “সুরেন্দ্রনাথ আমাদিগকে পেট্রিয়টিজম-এ অথবা স্বদেশভক্তিতে দীক্ষিত করিয়াছিলেন। নবগোপাল মিত্র ন্যাশনালিজম্ বা স্বাজাত্যাভিমানে দীক্ষা দিয়াছিলেন।” সুরেন্দ্রনাথের নব্য ইতালীয় স্বাধীনতার ইতিহাসের কথার প্রচার সে যুগে স্বদেশপ্রেমের জোয়ার আনে। ইতালীর প্রাচীন বিপ্লবীবাদী কারবনারিদের মতো এদেশের ছাত্ররাও ছোটো ছোটো গুপ্ত সমিতি গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়। লেখকও শিবনাথ শাস্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত ‘সাধক দল’-এর সদস্য হয়েছিলেন। হিন্দুমেলা, স্বদেশি আন্দোলন, জাতীয় শিক্ষার প্রসার প্রভৃতি নানা বিষয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে লেখক সমসাময়িককালের রাজনৈতিক তথা সামাজিক ইতিহাসকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন। লেখকের জাতীয় চেতনা উন্মেষের বর্ণনার মধ্যে সেই সময়ের মানুষের ভাবনার প্রতিফলন পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থটিও সমসাময়িক ইতিহাসের নানান টুকরো ছবি আমাদের সামনে নিয়ে আসে। যদিও রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য, “এই স্মৃতির ভান্ডারে অত্যন্ত যথাযথরূপে ইতিহাস সংগ্রহের চেষ্টা ব্যর্থ হইতে পারে”- তবু জীবনস্মৃতি অজান্তেই হয়ে ওঠে সে সময়কার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিল। ‘জীবনস্মৃতি’র মাধ্যমে, হিন্দুমেলা, স্বদেশি যুগ, স্বদেশি ভাবনা সম্পর্কিত নানা তথ্য পাওয়া যায়। ‘জ্যোতি দাদা’র উদ্যোগে ‘স্বাদেশিকতার সভা’ অনুষ্ঠিত করা, স্বদেশে দিয়াশলাই কারখানা তৈরির সমবেত প্রচেষ্টা, রাজনারায়ণ বসুর সঙ্গে উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠা- এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন/এক কার্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন প্রভৃতির মধ্য দিয়ে স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আত্মিক যোগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই এ কথা বলাই বাহুল্য ‘জীবনস্মৃতি’ শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তা উন্মেষের কাহিনি নয়। সমকালীন ইতিহাসের নানা টুকরো ছবিতে সমৃদ্ধ জীবনস্মৃতির ‘ছবিঘর’।

সরলাদেবী চৌধুরানীর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’য় এক বালিকার বড় হয়ে ওঠার কথা রয়েছে। একইসাথে রয়েছে আমাদের দেশের একটি বিশেষ সময়ের ইতিহাস। জাতীয়তাবাদের প্রভাবে দেশ যখন আন্দোলিত, তখন সরলাদেবীও এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বাঙালি যুবকদের স্বাধীনতা সংগ্রামের উপযুক্ত করে তোলার উদ্দেশ্যে তাদের অস্ত্রশিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করেন। গড়ে তোলেন ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’, ‘উদয়াদিত্য উৎসব’ বা ‘বীরাষ্টমীর’ মতো অনুষ্ঠান। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে স্বদেশি-যুগ-তথা স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের নানান তথ্য। এখানে উল্লেখ্য ‘বন্দেমাতরম’ গানটিতে প্রথম দুটি পদ ছাড়া বাকিটুকুতে সরলাদেবী সুর দিয়েছিলেন। বইটিতে তৎকালীন সামাজিক ইতিহাসেরও প্রচুর উপাদান নিহিত আছে। অভিজাত পরিবারের কায়দাকানুন, দুধমা-ধাইমা দিয়ে সন্তানপালন, গৃহশিক্ষক প্রথা, মেয়েদের শিক্ষার কথা, ঠাকুরবাড়ির জন্মদিন পালনের রীতি, শাড়ি-পরার আধুনিক রীতি, রাখিবন্ধন, বসন্ত উৎসব পালনের রীতি, মাঘোৎসব প্রভৃতি সে যুগের সমাজজীবনের নানাদিক তুলে ধরে।

এই তিনটি গ্রন্থ (‘সত্তর বৎসর’, ‘জীবনস্মৃতি’, ‘জীবনের ঝরাপাতা’) প্রকৃতপক্ষে লেখকদের ব্যক্তিজীবনের নানা কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সময়ের আয়নাও হয়ে উঠেছে।

Ron'e Dutta

Ron'e Dutta

Ron'e Dutta is a journalist, teacher, aspiring novelist, and blogger who manages Online Free Notes. An avid reader of Victorian literature, his favourite book is Wuthering Heights by Emily Brontë. He dreams of travelling the world. You can connect with him on social media. He does personal writing on ronism.

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Only for registered users

Meaning
Tip: select a single word for meaning & synonyms. Select multiple words normally to copy text.