logo

সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা: WBBSE ক্লাস 10 ইতিহাস (History)

Leave a Comment

post

এখানে (chapter 4) সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা: WBBSE ক্লাস 10 ইতিহাস (History) (Bengali medium) আধুনিক ভারতের ইতিহাস ও পরিবেশ (Adhunik Bharater Itihas O Poribesh)-এর উত্তর, ব্যাখ্যা, সমাধান, নোট, অতিরিক্ত তথ্য, এমসিকিউ এবং পিডিএফ পাওয়া যাবে। নোটগুলো শুধুমাত্র রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করুন এবং প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করতে ভুলবেন না।

Select medium
English medium notes
Bengali medium notes
If you notice any errors in the notes, please mention them in the comments

সারাংশ (summary)

আমরা সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা (Sanghoboddhotar Gorar Kotha: Boishishto o Bishleshon) নিয়ে আলোচনা করব।

১৮৫৭ সালে ভারতে এক বিরাট বিদ্রোহ হয়েছিল। মীরাটের সিপাহীরা, মানে সৈন্যরা, ইংরেজ অফিসারদের কথা অমান্য করে দিল্লী চলে যায়। তারা মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহকে তাদের নেতা হতে অনুরোধ করে। এই বিদ্রোহের একটা বড় কারণ ছিল নতুন বন্দুকের টোটা, যাতে গরু আর শূকরের চর্বি মেশানো আছে বলে গুজব রটেছিল। এটা হিন্দু ও মুসলিম সিপাহীদের ধর্মের বিরুদ্ধে ছিল।

এই বিদ্রোহ শুধু সিপাহীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নানা সাহেব, তাঁতিয়া টোপী, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ এবং সাধারণ মানুষও এতে যোগ দেন। তাই অনেকে একে শুধু সিপাহী বিদ্রোহ (Sepoy Mutiny) না বলে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা গণবিদ্রোহও বলেন। কিন্তু সবার মধ্যে যোগাযোগ ভালো ছিল না, আর ইংরেজদের অস্ত্রশস্ত্র অনেক ভালো ছিল। তাই এক বছর লড়াই চলার পর ইংরেজরা এই বিদ্রোহ দমন করে।

বিদ্রোহের পর ইংরেজ রানী ভিক্টোরিয়া সরাসরি ভারতের শাসনভার নিজের হাতে নেন। তিনি একটি ঘোষণাপত্র (Maharanir Ghoshanapatra) জারি করেন। এতে তিনি অনেক ভালো ভালো কথা বলেন, যেমন – ভারতীয়দের চাকরি দেওয়া হবে, তাদের ধর্ম ও রাজার সম্মান করা হবে। কিন্তু আসলে বেশিরভাগ কথাই রাখা হয়নি। তাই অনেকে এটাকে একটা ‘রাজনৈতিক ধাপ্পা’ (rajnoitik dhappa) বলেন, মানে এটা ছিল মানুষকে শান্ত করার একটা কৌশল মাত্র।

এই বিদ্রোহের পর ভারতীয়রা বুঝতে পারে যে একজোট হয়ে দাবি জানাতে হবে। তাই অনেক সভা-সমিতি তৈরি হতে শুরু করে। এই সময়টাকে ‘সভা-সমিতির যুগ’ (Sabhā-Samitir Yug) বলা হয়। জমিদার সভা (Zamindar Sabha), ভারত সভা (Bharat Sabha) এরকম অনেক সমিতি তৈরি হয়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতারা এই সব সমিতির মাধ্যমে মানুষকে এক করতেন ও সরকারের কাছে দাবি জানাতেন।

এই সময়ে লেখা ও আঁকার মাধ্যমেও মানুষের মনে দেশের প্রতি ভালোবাসা জাগানো হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (Bankim Chandra Chattopadhyay) ‘আনন্দমঠ’ (Anandamath) নামে একটি বই লেখেন, যাতে ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি ছিল। স্বামী বিবেকানন্দ (Swami Vivekananda) ‘বর্তমান ভারত’ (Bartaman Bharat) লিখে দেশের মানুষকে জেগে উঠতে বলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) ‘গোরা’ (Gora) উপন্যাসে ভারতীয় একতা নিয়ে লেখেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Abanindranath Tagore) ‘ভারতমাতা’ (Bharat Mata) নামে একটি ছবি আঁকেন, যেখানে ভারতবর্ষকে একজন মায়ের মতো দেখানো হয়েছে। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (Gaganendranath Tagore) ব্যঙ্গচিত্র এঁকে ইংরেজ শাসন আর সমাজের নানা ভুল ধরিয়ে দিতেন। এইসব লেখা ও ছবি মানুষকে দেশের জন্য ভাবতে শিখিয়েছিল।

পাঠ্য প্রশ্ন ও উত্তর (Prantik textbook)

সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করো

(ক) বিদ্রোহী সিপাহিদের নেতৃত্বদানকারী নানা সাহেবের সামরিক বাহিনীর নেতা ছিলেন-

(i) কুনওয়ার সিং
(ii) মঙ্গল পান্ডে
(iii) তাঁতিয়া টোপী
(iv) খান বাহাদুর খান

উত্তর: (iii) তাঁতিয়া টোপী

(খ) কার্ল মার্কস ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহকে বলেছেন-

(i) জাতীয় বিদ্রোহ
(ii) মহাবিদ্রোহ
(iii) সিপাহি বিদ্রোহ
(iv) গণবিদ্রোহ

উত্তর: (i) জাতীয় বিদ্রোহ

(গ) ‘বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা’র সম্পাদক ছিলেন-

(i) কালীনাথ রায়
(ii) গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ
(iii) রাধাকান্ত দেব
(iv) প্রসন্নকুমার ঠাকুর

উত্তর: (ii) গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ

(ঘ) ‘হিন্দুমেলা’র উদ্দেশ্য ছিল-

(i) ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করা
(ii) হিন্দুধর্মের সংস্কারসাধন
(iii) দেশজ শিল্পের প্রসার
(iv) জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রসার।

উত্তর: (iv) জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রসার।

(ঙ) ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি আঁকেন-

(i) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(ii) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(iii) নন্দলাল বসু
(iv) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

উত্তর: (i) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নীচের বিবৃতিগুলির মধ্যে কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা লেখো

(ক) ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে গণবিদ্রোহ বলে অভিহিত করেছেন।

উত্তর: মিথ্যা

কারণ: রমেশচন্দ্র মজুমদার ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ মাত্র বলেই মনে করতেন, গণবিদ্রোহ বা জাতীয় সংগ্রাম হিসাবে স্বীকৃতি দেননি।

(খ) মহারানির ঘোষণাপত্রের দ্বারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হস্তে ভারতের শাসনভার তুলে দেওয়া হয়।

উত্তর: মিথ্যা

কারণ: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন ও মহারানির ঘোষণাপত্রের দ্বারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবলুপ্তি ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটেনের মহারানির হাতে তুলে দেওয়া হয়।

(গ) স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগে ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্র দেশবাসীকে উজ্জীবিত করে তুলেছিল।

উত্তর: ঠিক

কারণ: বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতটি পরবর্তীকালে স্বদেশি যুগ থেকে শুরু করে জাতীয় গণ-আন্দোলনে দেশবাসীকে উজ্জীবিত করার মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।

(ঘ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিত্রশিল্পে বেঙ্গল স্কুল বা ওরিয়েন্টাল আর্টের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

উত্তর: ঠিক

কারণ: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিত্রশিল্পে দেশীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করে ‘বেঙ্গল স্কুল’ বা ‘ওরিয়েন্টাল আর্ট’ নামে নতুন ধারার সূচনা করেন, যা স্বদেশি ভাবধারার দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

প্রদত্ত ভারতবর্ষের মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত করো

(ক) লখনউ।
(খ) ১৮৫৭-র বিদ্রোহের কেন্দ্র।
(গ) উত্তর ভারতের সিপাহি বিদ্রোহের একটি কেন্দ্র।

বামস্তম্ভের সঙ্গে ডানস্তম্ভ মেলাও
বামস্তম্ভডানস্তম্ভ
(i) জর্জ টমসন(a) ভারত সভা
(ii) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়(b) আনন্দমঠ
(iii) সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর(c) বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া
(iv) বঙ্গদর্শন(d) হিন্দুমেল

উত্তর:

বামস্তম্ভডানস্তম্ভ
(i) জর্জ টমসন(c) বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া
(ii) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়(a) ভারত সভা
(iii) সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর(d) হিন্দুমেলা
(iv) বঙ্গদর্শন(b) আনন্দমঠ
একটি বাক্যেউত্তর দাও

ক. এনফিল্ড রাইফেলের টোটা কীভাবে ব্যবহার করতে হত?

উত্তর: এনফিল্ড রাইফেলের নতুন টোটাগুলিতে গোরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে বলে কথা শোনা যাওয়ায়, এবং দাঁতে কেটে এই টোটা ব্যবহার করতে হত বলে সিপাহিরা মনে করেন যে কোম্পানি তাঁদের ধর্ম ও জাতি নাশ করার চেষ্টা করছে।

খ. ১৮৫৭-র বিদ্রোহ সম্পর্কে জে. বি. নর্টন কী মন্তব্য করেছিলেন?

উত্তর: জে. বি. নর্টন মন্তব্য করেছিলেন যে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ সামান্য সিপাহি বিদ্রোহ ছিল না, এই অভ্যুত্থান গণবিদ্রোহের রূপ ধারণ করেছিল এবং অযোধ্যায় সারা দেশবাসীর সশস্ত্র অভ্যুত্থান দেখা গিয়েছিল যেখানে বর্শা, ধনুক ও দেশি বন্দুকধারী অগণিত লোকের সঙ্গে লড়াই হয়েছিল।

গ. ‘ব্রিটিশ ভারত সভা’ কোন্ দুটি সংস্থাকে যুক্ত করে তৈরি হয়?

উত্তর: ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ‘জমিদার সভা’ ও ‘বেঙ্গল ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া সোসাইটি’, এই দুটি সংস্থাকে যুক্ত করে ‘ব্রিটিশ ভারত সভা’ বা ‘British-Indian Association’ নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি হয়।

ঘ. ভারত সভার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দুটি আন্দোলনের উল্লেখ করো।

উত্তর: ভারত সভার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দুটি আন্দোলন হল ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা সংক্রান্ত আন্দোলন এবং ইলবার্ট বিল আন্দোলন।

ঙ. ‘আনন্দমঠ’-এর কাহিনিতে কোন্ সময়ের কথা লেখক তুলে ধরেছেন?

উত্তর:
‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আঠারো শতকের শেষ দিকে বাংলার এক সংকটজনক সময়ের ছবি তুলে ধরেছেন, যা মোগল যুগের সমাপ্তি এবং ইংরেজ আমলের গোড়ার দিক পর্যন্ত বিস্তৃত।

চ. বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধটি’ কবে, কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল?

উত্তর:
বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধটি ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে উদ্বোধন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন

ক. সিপাহি বিদ্রোহের সঙ্গে ১৮৫৭-র পূর্বের সংগঠিত ইংরেজ-বিরোধী প্রতিরোধ ও অভ্যুত্থানগুলির কী কোনো চরিত্রগত পার্থক্য ছিল?

উত্তর: ১৮৫৭ সালের আগের প্রতিরোধ ও অভ্যুত্থানগুলি ছিল অসংগঠিত এবং সেগুলি কখনই আঞ্চলিকতার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারেনি। কিন্তু ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে এই প্রথমবার আঞ্চলিক গণ্ডির সীমারেখা ভেঙে গিয়েছিল এবং এমন বিশাল গণ-অভ্যুত্থান ভারতের গণবিদ্রোহের ইতিহাসে কোম্পানি-রাজের বিরুদ্ধে আগে কখনও হয়নি।

খ. সিপাহিরা তাদের বিদ্রোহকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল?

উত্তর: বিদ্রোহের আগে পরিকল্পনা ও সংগঠনের অভাব থাকলেও বিদ্রোহ শুরুর পর তা নিশ্চিতভাবেই গড়ে উঠেছিল। দিল্লি দখলের পরেই সব প্রতিবেশী রাজ্যের শাসকদের কাছে বিদ্রোহে সমর্থন চেয়ে ও যোগদানের আহ্বান জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। দিল্লিতে প্রশাসকদের একটি দরবার স্থাপন করা হয়েছিল, যার দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রশাসন সংক্রান্ত সমস্ত ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া। অন্যান্য জায়গাতেও সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়াস চালানো হয়েছিল।

গ. সভা-সমিতির যুগ কাকে বলে?

উত্তর: উনিশ শতকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা এবং রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ হতে থাকে। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে তাঁরা বিভিন্ন সামাজিক, প্রশাসনিক সংস্কারসাধনে ও ভারতবাসীর অধিকার রক্ষার জন্য নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক সংস্থা গঠনের সূচনা করেন। এই সময় অনেকগুলি সভা-সমিতি গড়ে ওঠে, যা জাতীয়তাবাদী ভাবধারা এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে। এই কারণে ঐতিহাসিক ড. অনিল শীল উনিশ শতককে ‘The Age of Associations’ বা ‘সভা-সমিতির যুগ’ বলে চিহ্নিত করেছেন।

ঘ. ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন কোন্টি? এই সংগঠনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন ছিল ‘ব্রিটিশ ভারত সভা’ বা ‘British-Indian Association’, যা ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ‘জমিদার সভা’ ও ‘বেঙ্গল ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া সোসাইটি’ যুক্ত করে তৈরি হয়। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের অবস্থার উন্নতিসাধন করা এবং আইন ও প্রশাসন ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত করা।

ঙ. ‘হিন্দুমেলা’ গড়ে ওঠার পিছনে কী কারণ ছিল বলে তোমার মনে হয়?

উত্তর:
উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার একদিকে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা বিকাশে সহায়ক হলেও, অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ যুবসমাজকে নিজের ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এই অবস্থায় রাজনারায়ণ বসু, নবগোপাল মিত্র, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ বাঙালি মনীষীরা দেশের যুবসমাজকে ঐতিহ্যমুখী করে তুলে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রসারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন, আর এই উদ্দেশ্যেই হিন্দুমেলার জন্ম হয়।

চ. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রের বিষয় কী ছিল?

উত্তর:
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রের বিষয় ছিল সমকালীন সমাজ ও সময়ের নানান অসংগতি। তাঁর ব্যঙ্গচিত্রগুলিতে ঔপনিবেশিক সমাজের সমালোচনা ফুটে উঠত, যেখানে বিদেশি শাসকদের পাশাপাশি দেশীয় নেতারা, এমনকি রবীন্দ্রনাথও ব্যঙ্গের আওতায় পড়তেন। ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে মাথা নোয়ানো মানুষ, শহুরে জীবনের কৃত্রিম সাহেবিয়ানা, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর আবিষ্কার, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের গবেষণা, রবীন্দ্রনাথের প্রথম বিমান চড়া, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ ইত্যাদি নানা বিষয় তাঁর শ্লেষাত্মক কার্টুন চিত্রের বিষয়বস্তু ছিল।

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন

ক. ১৮৫৭-র বিদ্রোহে কারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন? এই নেতৃত্বে কী কোনো সমস্যা ছিল বলে তোমার মনে হয়?

উত্তর:
বাহাদুর শাহকে ভারত সম্রাট করার কথা ঘোষণা হলে ভারতের নানা প্রান্তে অভূতপূর্ব উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের দত্তক পুত্র নানা সাহেবের সামরিক বাহিনী কানপুরের সিপাহি বিদ্রোহে যোগ দেয়। নানা সাহেবের সামরিক বাহিনীর নেতা তাঁতিয়া টোপী বিদ্রোহী সিপাহিদের নেতৃত্বদান করেন। একে একে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, অযোধ্যার বেগম, খান বাহাদুর খান, কুনওয়ার সিং প্রমুখ বিদ্রোহে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন।

বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকেই বিদেশি শাসনকে ঘৃণা করত। এইটুকু ছাড়া সামগ্রিক রাজনীতি বা দূরবর্তী ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ‘নিজেদের অতীতের হাতে বন্দী।’ নতুন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার আগমনের কথা তাঁদের জানানোর ক্ষমতা ছিল না। জন লরেন্স ঠিকই বলেছেন, “তাদের (বিদ্রোহীদের) মধ্য থেকে যদি একজনও যোগ্য নেতার আবির্ভাব ঘটত তাহলে আমরা এমন গো-হারা হারতাম যে সেই ক্ষতি আর পূরণ করা যেত না।”

খ. ১৮৫৭-র বিদ্রোহ কী শুধুমাত্র সিপাহিদের বিদ্রোহ ছিল, নাকি একে গণবিদ্রোহও বলা যেতে পারে?

উত্তর:
অনেক ইউরোপীয় ঐতিহাসিক এই বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ (Sepoy Mutiny) বলে অভিহিত করেছেন। তবে অনেকের কাছেই এই মত যুক্তিগ্রাহ্য নয়। ব্যারাকপুরের ব্রাহ্মণ সিপাহি মঙ্গল পান্ডের ফাঁসির প্রতিবাদে যে বিদ্রোহের সূচনা, বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে যে বিদ্রোহের প্রসার তা ক্রমে সংক্রমিত হয় দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। ডক্টর এ. আর. দেশাইয়ের মতে “১৮৫৭-র বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনে নির্যাতিত বিভিন্ন শ্রেণীর ভারতবাসীর সম্মিলিত অসন্তোষের ফল। এই অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল রাজনৈতিক বিস্তৃতি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং নানা সামাজিক উদ্ভাবন থেকে।”

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে চার্লস রেইকস্ তাঁর ‘Notes on the Revolt in North Western Provience of India’-তে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সংগঠিত বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ বলে অভিহিত করেন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জন লরেন্স, আর্ল রবার্টস প্রমুখরা রেইকস্-এর বক্তব্যে সহমত পোষণ করেন। উনিশ শতকের শেষে বাঙালি তথা ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা যেমন কিশোরীচাঁদ মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দাদাভাই নৌরজি, সৈয়দ আহমেদ খান প্রমুখরাও এই বিদ্রোহকে সিপাহিদের অভ্যুত্থান হিসাবেই ব্যাখ্যা করেছেন। কিশোরীচাঁদ মিত্রের মতে- “এই বিদ্রোহ ছিল অবশ্যই কেবলমাত্র সিপাহিদের অভ্যুত্থান। এক লক্ষ সিপাহি এই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন। এই অভ্যুত্থানে গণবিদ্রোহের ছিটেফোঁটাও ছিল না।” আধুনিক জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের মধ্যে রমেশচন্দ্র মজুমদার অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই বিদ্রোহ সিপাহি বিদ্রোহ মাত্র। সিপাহিরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্যই এই বিদ্রোহ করেছিল। ভারতীয় জনসাধারণের এক বিরাট অংশ এই বিদ্রোহে যোগদান করেনি। অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ সেনের কণ্ঠেও রমেশচন্দ্রের বক্তব্যই ধ্বনিত হয়েছে।

অন্যদিকে জে. বি. নর্টন তাঁর ‘Topics for Indian Statesman’-এ প্রথম উল্লেখ করেন যে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ সামান্য সিপাহি বিদ্রোহ ছিল না, এই অভ্যুত্থান গণবিদ্রোহের রূপ ধারণ করেছিল। নর্টন লিখেছিলেন-‘অযোধ্যায় সারা দেশবাসীর সশস্ত্র অভ্যুত্থান দেখা গেল। বর্শা, ধনুক ও দেশি বন্দুকধারী অগণিত লোকের সঙ্গে লড়াই হল।’ ডাফ, কায়ে, বল, ম্যালেসন প্রমুখ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নর্টনের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন। কার্ল মার্কস এই বিদ্রোহের মধ্যে ভারতের শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের ঐক্যের প্রকাশ লক্ষ করেছিলেন। পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক ড. শশীভূষণ চৌধুরী, ড. তারাচাঁদ প্রমুখ এই বিদ্রোহের মধ্যে গণ-উপাদান ও জাতীয় আবেগ-উদ্দীপনা লক্ষ করেছেন। ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ, মধ্য ভারতের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থান ঘটে তাকে গণবিক্ষোভ বলা যেতেই পারে। কার্ল মার্কস এই বিদ্রোহ প্রসঙ্গে বলেছিলেন-ব্রিটিশ শাসক যেটাকে সামরিক বিদ্রোহ বলে ভাবছে সেটা আসলে একটা জাতীয় বিদ্রোহ। New York Daily Tribune পত্রিকায় তিনি একে ‘ভারতের প্রথম ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বিদ্রোহী সিপাহিরা ছিল জাতীয় বিদ্রোহের ‘ক্রিয়াশীল হাতিয়ার মাত্র’।

গ. মহারানির ঘোষণাপত্রে কী কী বলা হয়েছিল?

উত্তর: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বরে এলাহাবাদে এক দরবারে আনুষ্ঠানিক ভাবে মহারানির ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। এই ঘোষণাপত্রে ভারতবাসীর আনুগত্যলাভের উদ্দেশ্যে কয়েকটি আশ্বাসবাণী উচ্চারিত হয়, যেমন- স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হবে। ব্রিটিশ সরকার রাজ্যবিস্তার নীতি বর্জন করবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত যোগ্যতাসম্পন্ন ভারতীয়দের সরকারি পদে নিযুক্ত করা হবে। দেশীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে ইতিপূর্বে সম্পাদিত চুক্তিগুলি বহাল থাকবে। দেশীয় রাজন্যবর্গ দত্তক গ্রহণ করতে পারবে। ভারতের চিরায়ত রীতি-নীতি, ধর্ম ও সামাজিক বিষয়ে সরকার অহেতুক হস্তক্ষেপ করবে না। বিদ্রোহে প্রত্যক্ষ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে মুক্তি দেওয়া হবে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তিও ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

ঘ. ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবোধ কীভাবে ফুটে উঠেছে?

উত্তর:
এই সময় অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি মানুষের মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। এই ছবিটির মধ্য দিয়ে অবনীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবোধ ফুটে উঠেছে। শিল্পীর ভাবনায়, ভারতমাতা গেরুয়া বসন পরিহিতা যোগিনী মূর্তি। তিনি বরাভয়দায়িনী। ত্যাগ ও বৈরাগ্যের মূর্ত প্রতীক। ভারতমাতার চার হাতে শোভা পায় রুদ্রাক্ষের মালা, শুভ্রবস্ত্র, পুঁথি ও শ্যামল শস্যগুচ্ছ। ভারতমাতা চিত্রটির মধ্য দিয়ে শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ধনধান্যপূর্ণ সমৃদ্ধশালী ভারতের ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন। এই ভারতবর্ষ শিক্ষা-সংস্কৃতিতে উন্নত ভারতবর্ষ। ত্যাগ ও শান্তির আদর্শে মহিমান্বিত ভারতবর্ষ। ভারতমাতা চিত্রটি স্বদেশি যুগে বিভিন্ন সভা, সমাবেশে সজ্জিত হত। ভগিনী নিবেদিতা মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় ছবিটির কল্পনা ও অনুভবের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।

ঙ. ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থটি দেশপ্রেমিকদের জাতীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত করে-এই মন্তব্যটির যথার্থতা বিচার করো।

উত্তর:
‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধে স্বামীজির স্বদেশের প্রতি আবেগ ফুটে উঠেছে। ‘স্বদেশ মন্ত্র’ শীর্ষক অনুচ্ছেদটিতে আত্মবিশ্বাসহীন, দুর্বল ভারতবর্ষের প্রতি স্বামীজি ধিক্কার জানিয়েছেন-“হে ভারত, এই পরানুবাদ, পরানুকরণ পরমুখাপেক্ষা, এই দাসসুলভ দুর্বলতা, এই ঘৃণিত জঘন্য নিষ্ঠুরতা-এই মাত্র সম্বলে তুমি উচ্চাধিকার লাভ করিবে?” তিনি ভারতবাসীকে জড়তা, অলসতা, হীনমন্যতা ত্যাগ করে আত্মশক্তিতে জেগে ওঠার ডাক দেন। দেশবাসীকে স্বদেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন-“ভুলিও না, তুমি জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত।” বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা জাতির প্রাণশক্তিকে ক্ষয় করে। তিনি ভারতবাসীকে সংকীর্ণ জাতপাতের গণ্ডি অতিক্রম করে এক হওয়ার আহ্বান জানান- “ভুলিও না নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই।” মানবজাতির অগ্রগতির ইতিহাস পর্যালোচনা করে বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন যে, এক সময় শূদ্রের উত্থান ঘটবেই। তিনি এই প্রবন্ধে বলেছেন, শূদ্রের উত্থান হলে এক নতুন সমাজব্যবস্থা স্থাপিত হবে। সেই সমাজ হবে সাম্য ও ন্যায়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক নতুন সমাজ। এক্ষেত্রে তাঁর জাতীয়তাবাদী ভাবনার সঙ্গে সমাজবাদ এক হয়ে গেছে। বিবেকানন্দের স্বদেশমন্ত্র ছিল দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা, আবেগ। তিনি এই প্রবন্ধে লেখেন- “ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসী।” দেশের সঙ্গে এই একাত্মবোধকেই তিনি ভারতবাসীর মধ্যে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। বর্তমান ভারত গ্রন্থ দেশপ্রেমিকদের জাতীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর লেখা প্রতিটি কথা ছিল প্রেরণার মতো। ধর্মের সঙ্গে মানুষ, সমাজ ও দেশকে একসূত্রে গেঁথে তিনি যে কর্মসাধনার নির্দেশ দেন তাই আধুনিক ভারত নির্মাণের মূল সূত্র হয়ে ওঠে। ‘বর্তমান ভারত’ সেই আধুনিক ভারত নির্মাণের দিককেই নির্দেশ করে। বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের মতে, “বিবেকানন্দই আমাদের জাতীয় জীবন গঠনকর্তা।” ঐতিহাসিক আর. জি. প্রধান তাঁকে ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক’ বলে অভিহিত করেন।

ব্যাখ্যাধর্মী প্রশ্ন

ক. ১৮৫৭-র বিদ্রোহের চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা করো।

উত্তর: ১৮৫৭-র বিদ্রোহের চরিত্র ও প্রকৃতি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। অনেক ইউরোপীয় ঐতিহাসিক এই বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ (Sepoy Mutiny) বলে অভিহিত করেছেন, তবে অনেকের কাছেই এই মত যুক্তিগ্রাহ্য নয়। ব্যারাকপুরের ব্রাহ্মণ সিপাহি মঙ্গল পান্ডের ফাঁসির প্রতিবাদে যে বিদ্রোহের সূচনা, বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে যে বিদ্রোহের প্রসার তা ক্রমে সংক্রমিত হয় দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। ডক্টর এ. আর. দেশাইয়ের মতে “১৮৫৭-র বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনে নির্যাতিত বিভিন্ন শ্রেণীর ভারতবাসীর সম্মিলিত অসন্তোষের ফল। এই অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল রাজনৈতিক বিস্তৃতি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং নানা সামাজিক উদ্ভাবন থেকে।”

সিপাহিরা ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রহরী এবং তাদের সাহায্যেই ইংরেজরা ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু তারা নানাভাবে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন, যেমন স্বল্প বেতন, ইউরোপীয় কর্মচারীর দুর্ব্যবহার, পদোন্নতির সুযোগের অভাব এবং বৈষম্যমূলক আচরণ। এনফিল্ড রাইফেলের নতুন টোটায় গোরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে এবং তা দাঁতে কেটে ব্যবহার করতে হবে শুনে সিপাহিরা মনে করেন যে কোম্পানি তাঁদের ধর্ম ও জাতি নাশ করার চেষ্টা করছে, যা অসন্তোষের বারুদে অগ্নিসংযোগ করে।

বিদ্রোহের আগে পরিকল্পনা ও সংগঠনের অভাব থাকলেও বিদ্রোহ শুরুর পর তা নিশ্চিতভাবেই গড়ে উঠেছিল। দিল্লি দখলের পরেই সব প্রতিবেশী রাজ্যের শাসকদের কাছে বিদ্রোহে সমর্থন চেয়ে ও যোগদানের আহ্বান জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। দিল্লিতে প্রশাসকদের একটি দরবার স্থাপন করা হয় এবং এই দরবারের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রশাসন সংক্রান্ত সমস্ত ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া। অন্যান্য জায়গাতেও সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়াস চালানো হয়।

বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকেই বিদেশি শাসনকে ঘৃণা করত, কিন্তু সামগ্রিক রাজনীতি বা দূরবর্তী ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। জন লরেন্সের মতে, তাদের মধ্যে একজনও যোগ্য নেতার আবির্ভাব ঘটলে ব্রিটিশদের পরাজয় নিশ্চিত ছিল।

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে চার্লস রেইকস্ তাঁর ‘Notes on the Revolt in North Western Provience of India’-তে এই বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ বলে অভিহিত করেন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জন লরেন্স, আর্ল রবার্টস প্রমুখরা তাঁর বক্তব্যে সহমত পোষণ করেন। উনিশ শতকের বাঙালি তথা ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা যেমন কিশোরীচাঁদ মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দাদাভাই নৌরজি, সৈয়দ আহমেদ খান প্রমুখরাও এই বিদ্রোহকে সিপাহিদের অভ্যুত্থান হিসাবেই ব্যাখ্যা করেছেন। কিশোরীচাঁদ মিত্রের মতে, এই বিদ্রোহ ছিল অবশ্যই কেবলমাত্র সিপাহিদের অভ্যুত্থান এবং এতে গণবিদ্রোহের ছিটেফোঁটাও ছিল না। আধুনিক জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের মধ্যে রমেশচন্দ্র মজুমদার জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই বিদ্রোহ সিপাহি বিদ্রোহ মাত্র এবং সিপাহিরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্যই এই বিদ্রোহ করেছিল, যাতে ভারতীয় জনসাধারণের এক বিরাট অংশ যোগদান করেনি। অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ সেনও মনে করেন, সিপাহিদের অভ্যুত্থানের সুযোগে একদল হতাশ সামন্তপ্রভু ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে অংশ নিয়েছিল এবং বিদ্রোহগুলি বিক্ষিপ্ত ছিল। এঁদের মতে, বিদ্রোহের প্রভাব অযোধ্যা ও উত্তরপ্রদেশের কয়েকটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিদ্রোহীদের নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হতে পারেনি। দাদাভাই নৌরজি মন্তব্য করেছিলেন যে ভারতীয় জনসাধারণ শুধু বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেনি তা নয়, উপরন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল এবং তাদের সমর্থন করেছিল।

অন্যদিকে জে. বি. নর্টন তাঁর ‘Topics for Indian Statesman’-এ প্রথম উল্লেখ করেন যে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ সামান্য সিপাহি বিদ্রোহ ছিল না, এই অভ্যুত্থান গণবিদ্রোহের রূপ ধারণ করেছিল। তিনি লিখেছিলেন অযোধ্যায় সারা দেশবাসীর সশস্ত্র অভ্যুত্থান দেখা গেল। ডাফ, কায়ে, বল, ম্যালেসন প্রমুখ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নর্টনের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন। কার্ল মার্কস এই বিদ্রোহের মধ্যে ভারতের শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের ঐক্যের প্রকাশ লক্ষ করেছিলেন। পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক ড. শশীভূষণ চৌধুরী, ড. তারাচাঁদ প্রমুখ এই বিদ্রোহের মধ্যে গণ-উপাদান ও জাতীয় আবেগ-উদ্দীপনা লক্ষ করেছেন। বিদ্রোহ দমন করতে ইংরেজদের এক বছর ধরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছিল, যা বিদ্রোহের জনসমর্থন প্রমাণিত করে। ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ, মধ্য ভারতের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থান ঘটে তাকে গণবিক্ষোভ বলা যেতেই পারে। কার্ল মার্কস এই বিদ্রোহ প্রসঙ্গে বলেছিলেন-ব্রিটিশ শাসক যেটাকে সামরিক বিদ্রোহ বলে ভাবছে সেটা আসলে একটা জাতীয় বিদ্রোহ। New York Daily Tribune পত্রিকায় তিনি একে ‘ভারতের প্রথম ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বিদ্রোহী সিপাহিরা ছিল জাতীয় বিদ্রোহের ‘ক্রিয়াশীল হাতিয়ার মাত্র’।

খ. ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে কি জাতীয় সংগ্রাম বলা যায়? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।

উত্তর:
১৮৫৭-র বিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম বলা যায় কিনা তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে।

জাতীয় সংগ্রাম বলার সপক্ষে যুক্তি: জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের অনেকেই মহাবিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। রজনীকান্ত গুপ্ত তাঁর ‘সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেছেন যে, সিপাহিরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে উজ্জীবিত হয়েই ইংরেজ শাসনের অবসান চেয়েছিল। বীর সাভারকরও এই বিদ্রোহকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক শশীভূষণ চৌধুরী একে একইসঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় যুদ্ধ ও গণবিদ্রোহ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। ড. শশীভূষণ চৌধুরী, ড. তারাচাঁদ প্রমুখ এই বিদ্রোহের মধ্যে গণ-উপাদান ও জাতীয় আবেগ-উদ্দীপনা লক্ষ করেছেন। সুশোভন সরকার সিপাহি বিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম আখ্যায় ভূষিত করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বের কোনো দেশের জাতীয় সংগ্রামেই শতকরা একশো ভাগ মানুষ অংশগ্রহণ করেনি, তবুও সেগুলি ইতিহাসের পাতায় মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসাবেই স্বীকৃতি পেয়েছে। কার্ল মার্কস এই বিদ্রোহ প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে ব্রিটিশ শাসক যেটাকে সামরিক বিদ্রোহ বলে ভাবছে সেটা আসলে একটা জাতীয় বিদ্রোহ এবং New York Daily Tribune পত্রিকায় তিনি একে ‘ভারতের প্রথম ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন।

জাতীয় সংগ্রাম না বলার সপক্ষে যুক্তি: ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার এই অভ্যুত্থানকে জাতীয় যুদ্ধ বা স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসাবে স্বীকৃতি দেননি। তাঁর মতে, যে সময় এই বিদ্রোহ সংগঠিত হয় ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা তখনও বিকাশ লাভ করেনি। তাছাড়া ভারতের সর্বত্র এই বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়েনি এবং দেশের সব প্রান্তের জনসাধারণের সঙ্গে বিদ্রোহের কোনো যোগাযোগই তৈরি হয়নি। অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ সেনও এই বিদ্রোহকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম বলতে নারাজ। তাঁর মতে, এই বিদ্রোহের ভারতীয় সিপাহিরা তেমন কোনো দেশপ্রেম, জাতীয় স্তরে পরিকল্পনা, সংগঠন, শৃঙ্খলাবোধ দেখাতে পারেনি। তাঁর মতে, সিপাহিদের অভ্যুত্থানের সুযোগে একদল হতাশ সামন্তপ্রভু ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে এই বিদ্রোহের অংশ হয়ে উঠেছিল এবং বিদ্রোহগুলি বিক্ষিপ্ত ছিল। দাদাভাই নৌরজি মন্তব্য করেছিলেন যে ভারতীয় জনসাধারণ এই বিদ্রোহে শুধু অংশগ্রহণ করেনি তা নয়, উপরন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল এবং তাদের সমর্থন করেছিল।

গ. ভারত সভার মূল উদ্দেশ্যগুলি কী ছিল? ভারত সভার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনগুলির পরিচয় দাও।

উত্তর:
ভারত সভার মূল উদ্দেশ্যগুলি ছিল:

  • দেশে এক শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলা।
  • ভারতের রাজনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ভারতবাসীদের সংঘবদ্ধ করা।
  • হিন্দু ও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করে রাজনৈতিক আন্দোলনে তাদের শামিল করা।

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারত সভার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারত সভা’ যথার্থ প্রয়োজন মেটায়, মধ্যবিত্ত শ্রেণির গণ-চেতনা প্রতিফলিত করে এবং বাংলার শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

ভারত সভার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক আন্দোলনগুলি: ভারত সভার উদ্যোগে সাধারণ রায়ত এবং চা বাগানের কুলি ইত্যাদি নিম্নবর্ণের মানুষদের কল্যাণে নানান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া পাবনার কৃষক বিদ্রোহের সমর্থনে এবং ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ‘রেন্ট আইন’-এর বিরুদ্ধে ভারত সভা আন্দোলন গড়ে তোলে।

  • ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা আন্দোলন: সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে এই আন্দোলন ছিল ভারত সভার এক উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পদক্ষেপ। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার নিয়মকানুন ও পরীক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ইউরোপীয়দের সুবিধার্থে নির্ধারণ করা হয়েছিল। ১৮৭৭ সালে বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করা হলে ভারতীয় ছাত্রদের পক্ষে পরীক্ষা দেওয়া অসম্ভব হয়ে যায়। এর বিরুদ্ধে সুরেন্দ্রনাথ প্রতিবাদ জানান, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বক্তৃতা দিয়ে জনমত গড়ে তোলেন এবং বিভিন্ন প্রদেশের রাজনৈতিক সংগঠনগুলির সাথে যোগাযোগ করে তাদের আন্দোলনের অংশ করে তোলেন। এই আন্দোলন সফল হয় এবং ইংরেজ সরকার সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করে পরীক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
  • দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র আইন ও অস্ত্র আইনের বিরোধিতা: ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতবাসীর জনমত রুদ্ধ করার জন্য দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির উপর বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। এছাড়া অস্ত্র আইন বলবৎ করে ভারতীয়দের আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়। ভারত সভা এর বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে আন্দোলন শুরু করে।
  • ইলবার্ট বিল আন্দোলন: বিচার ব্যবস্থায় ভারতীয় ও ইউরোপীয়দের মধ্যে বৈষম্য দূর করার জন্য উদারপন্থী বড়লাট লর্ড রিপন ‘ইলবার্ট বিল’ নামে এক আইনের পরিকল্পনা করেন। ইলবার্টের প্রস্তাব প্রকাশিত হওয়ার পর ইউরোপীয়রা প্রতিবাদে মুখর হলে সুরেন্দ্রনাথ এই প্রতিবাদের প্রত্যুত্তরে এবং ইলবার্ট বিলের সপক্ষে দেশ জুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয়দের স্বার্থ সুরক্ষিত করে বিলটি সংশোধন করা হয় এবং মূল আদর্শ ব্যর্থ হয়, তবুও ভারত সভা পরিচালিত আন্দোলন ভারতীয়দের জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত করে তোলে।

ঘ. জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রচারের ক্ষেত্রে হিন্দুমেলার অবদান সম্পর্কে লেখো।

উত্তর: উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার একদিকে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা বিকাশের সহায়ক হলেও, অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষা, সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ যুবসমাজকে নিজের ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। এই অবস্থায় রাজনারায়ণ বসু, নবগোপাল মিত্র, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ বাঙালি মনীষীরা যুবসমাজে জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। দেশের যুবসমাজকে ঐতিহ্যমুখী করে তুলে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রসারের উদ্দেশ্যেই হিন্দুমেলার জন্ম হয়।

হিন্দুমেলার প্রথম অধিবেশন বসেছিল ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের চৈত্র সংক্রান্তিতে। প্রথমে এর নাম ছিল চৈত্রমেলা, পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় হিন্দুমেলা। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার হিন্দুমেলার তিনটি উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন—জাতীয় ভাবের প্রসার ঘটানো, জনগণের মধ্যে দেশাত্মবোধের ভাবনা জাগিয়ে তোলা ও হিন্দুদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার মনোভাব গড়ে তোলা। হিন্দুমেলার প্রথম অধিবেশনে নানা প্রকার কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল, যেমন—হিন্দুদের মধ্যে ঐক্যস্থাপন, হিন্দু সমাজের উন্নয়নসাধন, ‘স্বজাতীয় বিদ্যানুশীলনের উন্নতিসাধনে নিয়োজিত’ ব্যক্তিদের সম্মানিত করা, প্রত্যেক মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থানের শিল্পজাত পণ্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। এছাড়াও হিন্দুমেলায় শরীরচর্চার বিষয়েও উৎসাহদান করা হয়।

হিন্দুমেলার স্বদেশি ভাবধারার আনুকূল্যে নবগোপাল মিত্র ন্যাশনাল স্কুল, ন্যাশনাল সোসাইটি, ন্যাশনাল জিমনাসিয়াম স্থাপন করেন। ন্যাশনাল থিয়েটার স্থাপনেও হিন্দুমেলার প্রভাব ছিল। হিন্দুমেলা নিছক হিন্দুধর্মের প্রতিষ্ঠান ছিল না, এর মূল লক্ষ্য ছিল স্বদেশ ভাবনার প্রসার।

হিন্দুমেলা চোদ্দো বছর ধরে চলেছিল। জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রসারে এর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। হিন্দুমেলার দ্বারা বাংলা ভাষার প্রসার ঘটে। বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ বুঝতে পারে জাতীয় ভাষার উন্নতি ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি হতে পারে না। এই মেলা দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। হিন্দুমেলা জাতির মনে আত্মনির্ভরতার বীজ বপন করে, যা পরবর্তীকালে স্বদেশি আন্দোলনের ভাবনাকে অণুপ্রাণিত করেছিল। কিশোর বয়সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু মেলার অধিবেশনে কবিতা রচনা করে আবৃত্তি করেন এবং জাতীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত হন।

ঙ. ‘গোরা’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে স্বদেশভাবনা, জাতীয়তাবোধ কীভাবে ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

উত্তর: ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাসটি ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষের এক বিশেষ অধ্যায়কে তুলে ধরে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশি আন্দোলনের কারণে সারা বাংলা যখন দেশাত্মবোধের উন্মাদনায় অনুপ্রাণিত ও আলোড়িত, নায়ক গোরা সেই ভাবোন্মাদনার প্রতিমূর্তি। স্বদেশি আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং উপন্যাসের নায়ক গোরার মধ্যে স্বদেশ-ভাবনা ও জাতীয়তাবোধ তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সঞ্চারিত করেছেন।

উপন্যাসে একদিকে স্বদেশি আন্দোলনে চরমপন্থী নামে পরিচিত জাতীয়তাবাদীদের উগ্রতা, অন্যদিকে নরমপন্থী কংগ্রেস রাজনীতির শহরকেন্দ্রিক অবস্থান—এই দুইটি বিষয় রবীন্দ্রনাথকে পীড়িত করে। রবীন্দ্রনাথ শহরের শিক্ষিত মানুষ ও অগণিত বঞ্চিত গ্রামীণ মানুষের মধ্যে বিস্তর দূরত্ব অনুভব করে দেখিয়েছেন যে, কলকাতার শিক্ষিত ভদ্রসমাজের বাইরে নিভৃত প্রকাণ্ড গ্রাম্য ভারতবর্ষ কত বিচ্ছিন্ন, সংকীর্ণ ও দুর্বল। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন এই বিচ্ছিন্ন ‘ভারতবর্ষ’ই এ দেশের বাস্তব রূপ এবং একে অবহেলা করে দেশের মুক্তি সম্ভব নয়।

‘গোরা’ চরিত্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তাকে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা করে তুলেছে। ইংরেজ শাসনের প্রতি গোরার বিদ্রোহী মনোভাব বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে, যেমন স্কুলে পড়ার সময় ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে’ আবৃত্তি করা বা পথে সাহেব দেখলে তাদের তাড়া করা। গোরা যৌবনের আবেগে ও দেশপ্রেমের উন্মাদনায় হিন্দুধর্মকে আশ্রয় করে জাতীয়তাবাদের পথ সন্ধান করে। উনিশ শতকের মধ্যভাগের পরে হিন্দুধর্ম রক্ষার তাগিদে সনাতন পথে জাতীয়তাবাদ প্রসারের উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল, যা কিশোর রবীন্দ্রনাথ হিন্দুমেলায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। গোরার মধ্যে হিন্দুধর্মীয় পথে জাতীয়তাবোধের উৎসাহ আসলে রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতার ফসল।

গোরা একসময় নিজের আইরিশ মাতার সন্তান হওয়ার জন্মপরিচয় জানতে পেরে এক নতুন সত্যের উপলব্ধি লাভ করে। জাতি-বর্ণ-ধর্ম-এর সংকীর্ণ গণ্ডিকে অতিক্রম করে সে নিজেকে ‘ভারতবর্ষীয়’ বলে পরিচয় দেয়। সে বলে, “ভারতবর্ষের সকলের জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন।” স্বামী বিবেকানন্দের সর্বধর্ম সমন্বিত জাতীয়তাবোধের ভাবনাই রবীন্দ্রনাথ এখানে তুলে ধরেছেন। গোরা সেই দেবতার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে চায় “যিনি কেবল হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা”। রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনাই গোরা রচনার অব্যবহিত পরেই রচিত ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় ফুটে ওঠে—”হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে/এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে।” উপন্যাসে পরেশবাবু ভারতবর্ষের মুক্ত প্রশান্ত ভাবনার প্রতিফলন এবং আনন্দময়ী সংস্কারমুক্ত ভারত জননী। গোরা সেই ভারতের মুক্ত মানব।

অতিরিক্ত (Extras)

বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQs)

১. ১৮৫৭-র বিদ্রোহের সূচনা কখন ঘটেছিল?

ক. ১১ই মে
খ. ২৯ মার্চ
গ. ২০ সেপ্টেম্বর
ঘ. ১ নভেম্বর

উত্তর: ক. ১১ই মে

২. সিপাহিদের প্রধান অসন্তোষের একটি কারণ কী ছিল?

ক. স্বল্প বেতন
খ. ধর্মীয় বাধা
গ. ভূমি সমস্যা
ঘ. ভাষাগত বাধা

উত্তর: ক. স্বল্প বেতন

৩. নতুন এনফিল্ড রাইফেলের টোটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা কী ছিল?

ক. দাঁতে কেটে ব্যবহার
খ. বাতাসে ছড়ানো
গ. তেল মেশানো
ঘ. মশলা মেশানো

উত্তর: ক. দাঁতে কেটে ব্যবহার

৪. মিরাটে বিদ্রোহ ও দিল্লি দখলকে কীভাবে উল্লেখ করা হয়েছে?

ক. পূর্বাভাস
খ. সূচনা
গ. ফলাফল
ঘ. উদ্দীপনা

উত্তর: ক. পূর্বাভাস

৫. বিদ্রোহকে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা কোন নামে অভিহিত করেছেন?

ক. মহাবিদ্রোহ
খ. গণবিদ্রোহ
গ. সিপাহী বিদ্রোহ
ঘ. রাজনৈতিক বিদ্রোহ

উত্তর: গ. সিপাহী বিদ্রোহ

৬. ব্যারাকপুর সেনা ছাউনিতে বিদ্রোহের সূচনা কবে ঘটেছিল?

ক. ২৯ মার্চ
খ. ১১ই মে
গ. ২০ সেপ্টেম্বর
ঘ. ১ নভেম্বর

উত্তর: ক. ২৯ মার্চ

৭. বিদ্রোহে ভারতবাসীরা মূলত কোন শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল?

ক. কোম্পানি-রাজ
খ. ব্রিটিশ সরকার
গ. স্থানীয় রাজ্য
ঘ. কৃষি শাসন

উত্তর: ক. কোম্পানি-রাজ

৮. সিপাহী বিদ্রোহের ফলস্বরূপ ভারতের শাসন ব্যবস্থা কীভাবে পুনর্গঠিত হয়েছিল?

ক. ব্রিটিশ সরকারের সরাসরি শাসন
খ. স্বাধীনতা ঘোষণা
গ. রাজত্ব সংহতি
ঘ. জমির বণ্টন

উত্তর: ক. ব্রিটিশ সরকারের সরাসরি শাসন

৯. মহারানির ঘোষণাপত্রে কোন নীতি বাতিল করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল?

ক. স্বত্ববিলোপ নীতি
খ. শাসনবিস্তার নীতি
গ. শিক্ষানীতি
ঘ. সামাজিক নীতি

উত্তর: ক. স্বত্ববিলোপ নীতি

১০. মহারানির ঘোষণাপত্রে ভারতবাসীদের জন্য কোন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল?

ক. সরকারি পদে নিযুক্তি
খ. স্বরাষ্ট্র সংরক্ষণ
গ. ধর্মীয় হস্তক্ষেপ
ঘ. বিদেশী শাসন

উত্তর: ক. সরকারি পদে নিযুক্তি

১১. সভা-সমিতির যুগে প্রথম রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনার জন্য কে অবদান রাখেন?

ক. রামমোহন রায়
খ. দ্বারকানাথ ঠাকুর
গ. রাধাকান্ত দেব
ঘ. প্রসন্নকুমার ঠাকুর

উত্তর: ক. রামমোহন রায়

১২. বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা কখন প্রতিষ্ঠিত হয়?

ক. ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দ
খ. ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দ
গ. ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দ
ঘ. ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দ

উত্তর: ক. ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দ

১৩. জমিদার সভার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

ক. জমিদারের স্বার্থ সুরক্ষা
খ. শিক্ষিত সমাজের উন্নতি
গ. কৃষকের অধিকার
ঘ. রাজনৈতিক সংহতি

উত্তর: ক. জমিদারের স্বার্থ সুরক্ষা

১৪. বেঙ্গল-ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন কোন ইংরেজ নেতা?

ক. জর্জ টমসন
খ. জন লরেন্স
গ. কার্ল মার্কস
ঘ. ডা. এ. আর. দেশাই

উত্তর: ক. জর্জ টমসন

১৫. ভারত সভা প্রতিষ্ঠিত হয় কবে?

ক. ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ
খ. ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দ
গ. ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ
ঘ. ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দ

উত্তর: ক. ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ

১৬. ভারত সভার মুখপত্র হিসেবে কোন পত্রিকা পরিচিত ছিল?

ক. হিন্দু প্যাট্রিয়ট
খ. বঙ্গদর্শন
গ. রাষ্ট্রীয় সংবাদ
ঘ. স্বাধীনতা বার্তা

উত্তর: ক. হিন্দু প্যাট্রিয়ট

১৭. স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধের প্রকাশের মাস কোনটি ছিল?

ক. মার্চ ১৮৯৯
খ. নভেম্বর ১৮৫৮
গ. সেপ্টেম্বর ১৮৭৭
ঘ. ডিসেম্বর ১৮৩৬

উত্তর: ক. মার্চ ১৮৯৯

১৮. ‘গোরা’ উপন্যাসের নায়কের অভিজ্ঞতা কোন ধারার প্রকাশ করে?

ক. স্বদেশ-ভাবনা
খ. বিদেশী শিক্ষা
গ. আধুনিকতা
ঘ. অর্থনীতি

উত্তর: ক. স্বদেশ-ভাবনা

১৯. ‘গোরা’ উপন্যাসের নায়ক নিজের জন্মপরিচয়ে কী উপলব্ধি করেন?

ক. হিন্দু
খ. মুসলিম
গ. আইরিশ
ঘ. সিখ

উত্তর: গ. আইরিশ

২০. ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে দেশের মুক্তির জন্য কোন ধরনের সংগ্রামের কথা বলা হয়েছে?

ক. সশস্ত্র সংগ্রাম
খ. শান্তিপূর্ণ আন্দোলন
গ. আইনসঙ্গত প্রতিবাদ
ঘ. সমাবেশ

উত্তর: ক. সশস্ত্র সংগ্রাম

২১. ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

ক. দেশপ্রেম
খ. ধর্মসংগ্রাম
গ. বিদ্রোহ
ঘ. শিক্ষার প্রসার

উত্তর: ক. দেশপ্রেম

২২. হিন্দুমেলার প্রথম অধিবেশন কখন অনুষ্ঠিত হয়?

ক. ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ
খ. ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দ
গ. ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ
ঘ. ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দ

উত্তর: ক. ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ

২৩. হিন্দুমেলার প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?

ক. জাতীয় ভাবনার প্রসার
খ. বিদেশী সংস্কৃতি গ্রহণ
গ. শিল্পের বিকাশ
ঘ. রাজনৈতিক নীতি

উত্তর: ক. জাতীয় ভাবনার প্রসার

২৪. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রে প্রধানত কোন বিষয়ের সমালোচনা করা হয়েছে?

ক. ঔপনিবেশিক শাসন
খ. আধুনিক প্রযুক্তি
গ. কৃষি নীতি
ঘ. শিল্প উন্নয়ন

উত্তর: ক. ঔপনিবেশিক শাসন

২৫. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি?

ক. হ্যাঁ
খ. না
গ. অর্ধেক
ঘ. কখনোই

উত্তর: ক. হ্যাঁ

২৬. ভারতের সর্বপ্রথম সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন কোনটি?

ক. ভারত সভা
খ. ব্রিটিশ ভারত সভা
গ. ইন্ডিয়ান লীগ
ঘ. জমিদার সভা

উত্তর: ক. ভারত সভা

২৭. ইংরেজ সরকারের পরীক্ষা ব্যবস্থায় ভারতীয়দের সুবিধার জন্য কী পরিবর্তন আনা হয়েছিল?

ক. বয়স সীমা কমানো
খ. ভাষা পরিবর্তন
গ. মেধার পরীক্ষা
ঘ. পদ্ধতি পরিবর্তন

উত্তর: ক. বয়স সীমা কমানো

২৮. সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ইতিহাসে কোন নামে অভিহিত করা হয়েছে?

ক. রাষ্ট্রগুরু
খ. বুদ্ধিজীবী
গ. শিক্ষণামন্ত্রী
ঘ. রাজনীতিবিদ

উত্তর: ক. রাষ্ট্রগুরু

২৯. ইলবার্ট বিলের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থায় কোন বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করা হয়েছিল?

ক. বিচার বৈষম্য
খ. শিক্ষা বৈষম্য
গ. অর্থনৈতিক বৈষম্য
ঘ. ধর্মীয় বৈষম্য

উত্তর: ক. বিচার বৈষম্য

৩০. ১৮৫৭ বিদ্রোহের পর ভারতের শাসন ব্যবস্থা কীভাবে পুনর্গঠিত হয়েছিল?

ক. ব্রিটিশ সরকারের সরাসরি শাসন
খ. স্বাধীনতা
গ. গণতন্ত্র
ঘ. স্বায়ত্তশাসন

উত্তর: ক. ব্রিটিশ সরকারের সরাসরি শাসন

৩১. ‘ভারতমাতা’ চিত্রের মাধ্যমে শিল্পীর প্রধান বার্তা কী ছিল?

ক. দেশের মুক্তি
খ. জাতীয়তাবোধ
গ. সামর্থ্য প্রদর্শন
ঘ. ধনসম্পদ প্রকাশ

উত্তর: খ. জাতীয়তাবোধ

৩২. ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধে বিবেকানন্দের প্রধান আহ্বান কী ছিল?

ক. ঐক্যবদ্ধ হওয়া
খ. বিদ্রোহ করা
গ. বিদেশী শাসন সমর্থন
ঘ. বিভাজন

উত্তর: ক. ঐক্যবদ্ধ হওয়া

৩৩. ‘গোরা’ উপন্যাসে নায়ক নিজেকে কী নামে অভিহিত করে?

ক. ভারতবর্ষীয়
খ. হিন্দু
গ. মুসলিম
ঘ. ব্রিটিশ

উত্তর: ক. ভারতবর্ষীয়

৩৪. ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি কার রচিত?

ক. বঙ্কিমচন্দ্র
খ. রবীন্দ্রনাথ
গ. বিবেকানন্দ
ঘ. গগনেন্দ্রনাথ

উত্তর: ক. বঙ্কিমচন্দ্র

৩৫. ইন্ডিয়ান লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় কোন খ্রিস্টাব্দে?

ক. ১৮৭৫
খ. ১৮৭৬
গ. ১৮৭৭
ঘ. ১৮৭৮

উত্তর: ক. ১৮৭৫

৩৬. স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় শিক্ষিত বাঙালি সমাজ মহাবিদ্রোহকে কেন স্বাগত জানায়নি?

ক. বিদ্রোহ
খ. শান্তিপূর্ণ আন্দোলন
গ. বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন
ঘ. আইনসঙ্গত আন্দোলন

উত্তর: ক. বিদ্রোহ

৩৭. ‘স্বদেশ মন্ত্র’ প্রবন্ধে বিবেকানন্দের আহ্বান কী ছিল?

ক. জাতিগত ঐক্য
খ. ধর্মীয় বিভেদ
গ. অর্থনৈতিক উন্নতি
ঘ. শিক্ষাগত পরিবর্তন

উত্তর: ক. জাতিগত ঐক্য

প্রশ্ন ও উত্তর (Questions, Answers)

১. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সূচনা কোন সেনা ছাউনিতে হয়েছিল?

উত্তর: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সূচনা কলকাতার উত্তরে ব্যারাকপুর সেনা ছাউনিতে হয়েছিল।

২. মঙ্গল পান্ডে কাকে আক্রমণ করেছিলেন?

উত্তর: মঙ্গল পান্ডে তাঁর ঊর্ধ্বতন ইংরেজ অফিসারকে আক্রমণ করেন।

৩. এনফিল্ড রাইফেলের টোটা সম্পর্কে সিপাহিদের মনে কী ধারণা ছিল?

উত্তর: সিপাহিদের মনে ধারণা ছিল যে নতুন এনফিল্ড রাইফেলের টোটাগুলিতে গোরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে। দাঁতে কেটে এই টোটা ব্যবহার করতে হত বলে সিপাহিরা মনে করেন যে কোম্পানি তাঁদের ধর্ম ও জাতি নাশ করার চেষ্টা করছে।

৪. দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে কখন ভারতের সম্রাট ঘোষণা করা হয়?

উত্তর: দিল্লি দখল করার পর বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।

৫. কোন নেতা তাঁতিয়া টোপীর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর প্রধান ছিলেন?

উত্তর: নানা সাহেবের সামরিক বাহিনীর নেতা তাঁতিয়া টোপী বিদ্রোহী সিপাহিদের নেতৃত্বদান করেন।

৬. মহাবিদ্রোহের সময় দিল্লি পতনের তারিখ উল্লেখ করো।

উত্তর: ১৮৫৭-র ২০ সেপ্টেম্বর দিল্লির পতন হয়েছিল।

৭. মীরাট থেকে আসা সিপাহিরা দিল্লিতে কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করেছিলেন?

উত্তর: মীরাট থেকে আসা সিপাহিরা লালকেল্লায় ঢুকেছিলেন রাজঘাট দ্বার দিয়ে।

৮. ১৮৫৭-র বিদ্রোহের পর ভারতের শাসনভার কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়?

উত্তর: ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পর কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে ভারতের শাসনভার হস্তান্তরিত হয়।

৯. মহারানির ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয় কোথায়?

উত্তর: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বরে এলাহাবাদে এক দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে মহারানির ঘোষণা প্রকাশ করা হয়।

১০. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন কোন তারিখে পাস হয়?

উত্তর: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২ আগস্ট ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবলুপ্তি ঘটে।

১১. বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা কোন সালে প্রতিষ্ঠিত হয়?

উত্তর: ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমুখের উদ্যোগে ‘বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা’ গঠিত হয়।

১২. জমিদার সভার প্রথম সম্পাদক কে ছিলেন?

উত্তর: জমিদার সভার সম্পাদক নিযুক্ত হন প্রসন্নকুমার ঠাকুর।

১৩. ব্রিটিশ ভারত সভার প্রথম সভাপতি কে ছিলেন?

উত্তর: রাধাকান্ত দেব ছিলেন ব্রিটিশ ভারত সভার প্রথম সভাপতি।

১৪. ভারত সভা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কোন দুই ব্যক্তি?

উত্তর: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আনন্দমোহন বসুর যৌথ উদ্যোগে ভারত সভা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৫. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন চিত্রের জন্য বিখ্যাত?

উত্তর: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আঁকা ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির জন্য বিখ্যাত।

১৬. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ব্যঙ্গচিত্র প্রথম কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়?

উত্তর: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রগুলি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত প্রবাসী ও মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হত।

১৭. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ কেন সিপাহি বিদ্রোহ নামে পরিচিত?

উত্তর: অনেক ইউরোপীয় ঐতিহাসিক, যেমন চার্লস রেইকস্, জন লরেন্স, আর্ল রবার্টস প্রমুখ, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ (Sepoy Mutiny) বলে অভিহিত করেছেন। উনিশ শতকের শেষের দিকের কিছু ভারতীয় বুদ্ধিজীবী, যেমন কিশোরীচাঁদ মিত্র, এবং পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারও মনে করতেন যে এই বিদ্রোহ ছিল মূলত সিপাহিদের অভ্যুত্থান। তাঁদের মতে, সিপাহিরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই বিদ্রোহ করেছিল এবং এতে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ বা গণবিদ্রোহের উপাদান ছিল না, তাই এটি সিপাহি বিদ্রোহ নামেই পরিচিত।

১৮. ব্যারাকপুরে বিদ্রোহের সূচনার কারণ উল্লেখ করো।

উত্তর: ব্যারাকপুরে বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল মূলত এনফিল্ড রাইফেলের নতুন টোটা প্রবর্তনের প্রতিক্রিয়ায়। গুজব রটে যায় যে এই টোটাগুলিতে গোরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে এবং ব্যবহারের আগে দাঁত দিয়ে কেটে খুলতে হবে। এর ফলে সিপাহিরা মনে করে যে কোম্পানি তাঁদের ধর্ম ও জাতি নাশ করার চেষ্টা করছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলকাতার উত্তরে ব্যারাকপুর সেনা ছাউনিতে সিপাহিদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায় এবং এরই প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গল পান্ডে নামে এক সিপাহি ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ তাঁর ঊর্ধ্বতন ইংরেজ অফিসারকে আক্রমণ করেন, যা ব্যারাকপুরে বিদ্রোহের সূচনা করে।

১৯. ১৮৫৮ সালের মহারানির ঘোষণাপত্রের তিনটি প্রতিশ্রুতির উল্লেখ করো।

উত্তর: ১৮৫৮ সালের মহারানির ঘোষণাপত্রে ভারতবাসীর আনুগত্যলাভের উদ্দেশ্যে কয়েকটি আশ্বাসবাণী উচ্চারিত হয়, যার মধ্যে তিনটি প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল:
১. স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হবে।
২. ব্রিটিশ সরকার রাজ্যবিস্তার নীতি বর্জন করবে।
৩. জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত যোগ্যতাসম্পন্ন ভারতীয়দের সরকারি পদে নিযুক্ত করা হবে।

২০. ভারত সভার দুইটি প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ভারত সভার দুইটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল:
১. দেশে এক শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলা।
২. ভারতের রাজনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ভারতবাসীদের সংঘবদ্ধ করা।

২১. হিন্দুমেলার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: হিন্দুমেলার মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় ভাবের প্রসার ঘটানো, জনগণের মধ্যে দেশাত্মবোধের ভাবনা জাগিয়ে তোলা ও হিন্দুদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার মনোভাব গড়ে তোলা। এর মূল লক্ষ্য ছিল স্বদেশ ভাবনার প্রসার। এই মেলা দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে এবং হিন্দুমেলা জাতির মনে আত্মনির্ভরতার বীজ বপন করে, যা পরবর্তীকালে স্বদেশি আন্দোলনের ভাবনাকে অণুপ্রাণিত করেছিল।

২২. আনন্দমঠ উপন্যাসে দেশাত্মবোধের প্রকাশ কীভাবে ঘটেছে?

উত্তর: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে আঠারো শতকের শেষ দিকে বাংলার এক সংকটজনক সময়ের ছবি ফুটে উঠেছে। উত্তরবঙ্গের সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কাল্পনিক গৌরবময় ভূমিকায় স্থাপন করে বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসে দেশাত্মবোধের জাগরণ ঘটিয়েছেন। মোগল যুগের সমাপ্তি এবং ইংরেজ আমলের গোড়ার দিক পর্যন্ত এই কাহিনিপর্ব বিস্তৃত। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও শাসকদের অত্যাচারে বিপর্যস্ত অসহায় মানুষদের রক্ষা করার জন্য সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহ শুরু করেন। তাঁদের সশস্ত্র সংগ্রামের কাহিনির ওপর আনন্দমঠের আখ্যান রচিত।

এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটে চরমপন্থী আন্দোলনের মাধ্যমে। বঙ্কিম মনে করেছেন, দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও আইনকানুনের অবনতি ঘটলে তা পুনরুদ্ধারের জন্য তথা দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র সংগ্রাম। তাই এই উপন্যাসে সন্ন্যাসীরা তুলসীতলায় বিষুর উপাসনা করার পাশাপাশি প্রয়োজনে হাতে বন্দুক তুলে নেয়। বঙ্কিমচন্দ্র দেশের মুক্তির জন্য ডাকাতি, লুণ্ঠন ইত্যাদিকে অন্যায় কাজ বলে মনে করেননি। তাই ভবানন্দ ও তার সন্তানদল চুরি-ডাকাতি করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। বঙ্কিমের মতে, উদ্দেশ্য মহৎ হলে উপায় অসৎ হলেও চলে।

আনন্দমঠের সন্তানদল সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর মতো দেশমাতৃকাকে কালীরূপে আরাধনা করেছে। বঙ্কিমের ভাষায় যিনি দশভুজা তিনিই দেশমাতা। সন্তানদলের বীরত্ব, গেরিলা কায়দায় যুদ্ধের কৌশল ও আত্মদান বাংলার জনমানসে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বাংলার তরুণ বিপ্লবীরা আনন্দমঠের সন্তানদলের আদর্শে অণুপ্রাণিত হয়ে দেশমাতৃকার মুক্তিসাধনে উদ্যত হয়েছিল।

বঙ্কিমের জাতীয়তাবোধ ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রকাশ হল তাঁর ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত। ভবানন্দ যখন গেয়ে ওঠেন ‘বন্দে মাতরম/সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্য শ্যামলাং মাতরম’-তখন দেশমাতাকে উদ্দেশ্য করে এই গান রচিত হয়েছে। পরবর্তীকালে এই সংগীত জাতীয় আন্দোলনের রণসংগীতে পরিণত হয়। স্বদেশি যুগ থেকে বাংলার বিপ্লববাদী আন্দোলনে ও তারপর জাতীয় গণ-আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ বরাভয় মন্ত্র হিসাবে দেশবাসীকে উজ্জীবিত করে তোলে। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ বাঙালি জাতিকে জাতীয়তাবোধের মন্ত্রে দীক্ষিত করে।

২৩. গোরার চরিত্রে জাতীয়তাবাদী ভাবনার প্রকাশ কীভাবে ঘটেছিল?

উত্তর: ‘গোরা’ উপন্যাসের নায়ক গোরা স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে দেশাত্মবোধের উন্মাদনার প্রতিমূর্তি ছিলেন। গোরার মধ্যে স্বদেশ-ভাবনা ও জাতীয়তাবোধ রবীন্দ্রনাথ নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সঞ্চারিত করেছিলেন। ইংরেজ শাসনের প্রতি গোরার বিদ্রোহী মনোভাব বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছিল; যেমন, স্কুলে পড়ার সময় সে উদাত্ত কণ্ঠে ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে’ আবৃত্তি করত এবং পথে সাহেব দেখলে তাদের তাড়া করত। গোরা যৌবনের আবেগে ও দেশপ্রেমের উন্মাদনায় হিন্দুধর্মকে আশ্রয় করে জাতীয়তাবাদের পথ সন্ধান করেছিলেন। উনিশ শতকের মধ্যভাগের পরে হিন্দুধর্ম রক্ষার তাগিদে সনাতন পথে জাতীয়তাবাদ প্রসারের যে উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল, গোরার মধ্যে সেই হিন্দুধর্মীয় পথে জাতীয়তাবোধের উৎসাহ প্রতিফলিত হয়েছিল। পরে নিজের আইরিশ জন্মপরিচয় জানার পর গোরা জাতি-বর্ণ-ধর্মের সংকীর্ণ গণ্ডিকে অতিক্রম করে নিজেকে ‘ভারতবর্ষীয়’ বলে পরিচয় দেন এবং এমন এক দেবতার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে চান যিনি কেবল হিন্দুর দেবতা নন, ভারতবর্ষের দেবতা।

২৪. বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ গানের তাৎপর্য কী ছিল?

উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবোধ ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রকাশ ছিল তাঁর ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত। ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ভবানন্দ যখন এই গান গেয়ে ওঠেন, তখন তিনি মহেন্দ্রকে বুঝিয়ে বলেন যে, এই গানে যে ‘মা’-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে তিনি দেশমাতা, কারণ দেশপ্রেমিকের কাছে জননী ও জন্মভূমি এক। পরবর্তীকালে এই সংগীত জাতীয় আন্দোলনের রণসংগীতে পরিণত হয়। স্বদেশি যুগ থেকে বাংলার বিপ্লববাদী আন্দোলনে এবং তারপর জাতীয় গণ-আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ বরাভয় মন্ত্র হিসাবে দেশবাসীকে উজ্জীবিত করে তুলেছিল। এই গানের নামে ভারতে ও বিদেশে পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে বিপ্লববাদের আদর্শ প্রচারিত হয়।

২৫. বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধের মূল ভাবনা কী ছিল?

উত্তর: বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধে তাঁর জাতীয়তাবোধের প্রকাশ ঘটেছে, যা তাঁর ধর্মীয় ভাবনার সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত ছিল। তিনি সর্বধর্ম সমন্বিত এক ঐক্যবদ্ধ ভারত নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং অনুভব করেছিলেন যে জাতি, ধর্ম, ভাষার বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারলে ভারতের মুক্তি সম্ভব নয়। প্রবন্ধে স্বামীজির স্বদেশের প্রতি তীব্র আবেগ ফুটে উঠেছে; তিনি আত্মবিশ্বাসহীন, দুর্বল ভারতবর্ষের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে ভারতবাসীকে জড়তা, অলসতা, হীনমন্যতা ত্যাগ করে আত্মশক্তিতে জেগে ওঠার ডাক দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা জাতির প্রাণশক্তিকে ক্ষয় করে এবং তাই সংকীর্ণ জাতপাতের গণ্ডি অতিক্রম করে সকলকে এক হওয়ার আহ্বান জানান। প্রবন্ধে তিনি শূদ্রের উত্থান এবং তার ফলে সাম্য ও ন্যায়ের উপর ভিত্তি করে এক নতুন সমাজব্যবস্থা স্থাপিত হওয়ার কথাও বলেছেন, যেখানে তাঁর জাতীয়তাবাদী ভাবনার সঙ্গে সমাজবাদ এক হয়ে গেছে। বিবেকানন্দের স্বদেশমন্ত্র ছিল দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা ও আবেগ, এবং দেশের সঙ্গে এই একাত্মবোধকেই তিনি ভারতবাসীর মধ্যে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন।

২৬. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রে কী ধরনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে?

উত্তর: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রে সমকালীন সমাজ ও সময়ের ছবি ব্যঙ্গাত্মক রূপে ফুটে উঠেছে। তাঁর ব্যঙ্গচিত্রগুলিতে বিদেশি শাসকদের কটাক্ষ করার পাশাপাশি সমাজের নানা অসংগতি, ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে মাথা নোয়ানো মানুষ এবং শহুরে জীবনের কৃত্রিম সাহেবিয়ানাকেও শ্লেষাত্মক কার্টুন চিত্রের মাধ্যমে বিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু বিদেশি শাসকই নয়, দেশীয় নেতারাও তাঁর ব্যঙ্গের আওতার মধ্যে পড়েছেন; এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর ব্যঙ্গচিত্রের বিষয় হয়েছেন। এছাড়াও বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর আবিষ্কার, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের গবেষণা, রবীন্দ্রনাথের প্রথম বিমান চড়া, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আঁকা তাঁর কার্টুন চিত্রগুলি ইতিহাসের অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

২৭. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের একটি সদর্থক রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। দিল্লি দখল ও বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা করার ফলে এই বিদ্রোহ এক সদর্থক রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করল। ডক্টর এ. আর. দেশাইয়ের মতে এই বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়েছিল রাজনৈতিক বিস্তৃতি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং নানা সামাজিক উদ্ভাবন থেকে।

১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের ফলাফল ছিল বেশ গভীর ও সুদূরপ্রসারী। কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে ভারতের শাসনভার হস্তান্তরিত হওয়ায় জনগণের উপর শোষণের মাত্রা আরও বাড়ে। ভারতের শিক্ষিত শ্রেণিও ব্রিটিশ সরকারের সদিচ্ছা সম্পর্কে ক্রমে সন্দিহান হতে শুরু করে। মহাবিদ্রোহ ভারতবাসীকে এই শিক্ষা দেয় যে, সংগঠিতভাবে ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে। দাবি আদায়ের জন্য ইংরেজের বিরুদ্ধে আইনসংগত ও সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন সমিতি গঠন আরম্ভ হয়, যার ফলস্বরূপ শেষ পর্যন্ত সর্বভারতীয় স্তরে ‘জাতীয় কংগ্রেসে’-র উদ্ভব হয়। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন নানা খাতে বইতে থাকে এবং মহাবিদ্রোহের ৯০ বছর পরে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সাফল্য লাভ করে, ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়।

মহারানির ঘোষণাপত্রকে ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র ‘রাজনৈতিক ধাপ্পা’ বলে মন্তব্য করেন কারণ এর ফলে পুরাতন সাম্রাজ্যবাদী শাসন ব্যবস্থার মূল চরিত্রে কোনো হেরফের হয়নি, শুধুমাত্র বহিরঙ্গেই পরিবর্তন ঘটে। উনিশ শতকে সভা-সমিতিগুলি জাতীয়তাবাদী ভাবধারা এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে এবং একটি সার্বিক রাজনৈতিক মতাদর্শ গঠনে সহায়ক হয়। এই সভা সমিতিগুলি জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করে তোলে। ড: অনিল শীল-এর মতে, “রাজনৈতিক সমিতি গঠনের মাধ্যমে উনিশ শতকে ভারতবর্ষ আধুনিক রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করে।”

২৮. সিপাহি বিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম বলার যুক্তি আলোচনা করো।

উত্তর: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম বলা যায় কিনা তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের অনেকেই মহাবিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। রজনীকান্ত গুপ্ত তাঁর ‘সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেছেন যে, সিপাহিরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে উজ্জীবিত হয়েই ইংরেজ শাসনের অবসান চেয়েছিল। বীর সাভারকরও এই বিদ্রোহকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক শশীভূষণ চৌধুরী একে একইসঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় যুদ্ধ ও গণবিদ্রোহ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। ঐতিহাসিক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ড. তারাচাঁদ এবং ড. সুশোভন সরকার সিপাহি বিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম আখ্যায় ভূষিত করেছেন। এঁদের মতে, বিশ্বের কোনো দেশের জাতীয় সংগ্রামেই শতকরা একশো ভাগ মানুষ অংশগ্রহণ করেনি, তবুও সেগুলি ইতিহাসের পাতায় মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসাবেই স্বীকৃতি পেয়েছে।

কার্ল মার্কস এই বিদ্রোহ প্রসঙ্গে বলেছিলেন—ব্রিটিশ শাসক যেটাকে সামরিক বিদ্রোহ বলে ভাবছে সেটা আসলে একটা জাতীয় বিদ্রোহ। New York Daily Tribune পত্রিকায় তিনি একে ‘ভারতের প্রথম ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বিদ্রোহী সিপাহিরা ছিল জাতীয় বিদ্রোহের ‘ক্রিয়াশীল হাতিয়ার মাত্র’। এই বিদ্রোহে প্রথমবার আঞ্চলিক গণ্ডির সীমারেখা ভেঙে গিয়েছিল এবং দিল্লি দখল ও বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা করার ফলে এটি এক সদর্থক রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করেছিল।

২৯. মহারানির ঘোষণাপত্রের গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দীর্ঘ একশো বছরের অপ্রশাসনের ক্ষতে প্রলেপ দিতে মহারানির ঘোষণাপত্রে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এই ঘোষণাপত্রে ভারতবাসীর আনুগত্যলাভের উদ্দেশ্যে কয়েকটি আশ্বাসবাণী উচ্চারিত হয়, যেমন-
১. স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হবে।
২. ব্রিটিশ সরকার রাজ্যবিস্তার নীতি বর্জন করবে।
৩. জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত যোগ্যতাসম্পন্ন ভারতীয়দের সরকারি পদে নিযুক্ত করা হবে।
৪. দেশীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে ইতিপূর্বে সম্পাদিত চুক্তিগুলি বহাল থাকবে।
৫. দেশীয় রাজন্যবর্গ দত্তক গ্রহণ করতে পারবে।
৬. ভারতের চিরায়ত রীতি-নীতি, ধর্ম ও সামাজিক বিষয়ে সরকার অহেতুক হস্তক্ষেপ করবে না।
৭. বিদ্রোহে প্রত্যক্ষ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে মুক্তি দেওয়া হবে ও বাজেয়াপ্ত সম্পত্তিও ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

কিন্তু বাস্তবে এই সব প্রতিশ্রুতি সঠিকভাবে পালন করা হয়নি। মহারানির ঘোষণাপত্রকে ক্যানিংহাম ‘বাস্তব পরিবর্তন অপেক্ষা আনুষ্ঠানিক মাত্র’ বলেছেন। কারণ এই ঘোষণাপত্রের ফলে পুরাতন সাম্রাজ্যবাদী শাসন ব্যবস্থার মূল চরিত্রে কোনো হেরফের হয়নি, শুধুমাত্র বহিরঙ্গেই পরিবর্তন ঘটে। ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র এই ঘোষণাপত্রকে ‘রাজনৈতিক ধাপ্পা’ বলে মন্তব্য করেন।

৩০. ভারত সভার বিভিন্ন আন্দোলনের উল্লেখ করে এর ভূমিকা আলোচনা করো।

উত্তর: ভারত সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশে এক শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলা, ভারতের রাজনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ভারতবাসীদের সংঘবদ্ধ করা এবং হিন্দু ও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করে রাজনৈতিক আন্দোলনে তাদের শামিল করা। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারত সভার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারত সভা’ যথার্থ প্রয়োজন মেটায়, মধ্যবিত্ত শ্রেণির গণ-চেতনা প্রতিফলিত করে এবং বাংলার শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

ভারত সভার উদ্যোগে সাধারণ রায়ত এবং চা বাগানের কুলি ইত্যাদি নিম্নবর্ণের মানুষদের কল্যাণে নানান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া পাবনার কৃষক বিদ্রোহের সমর্থনে এবং ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ‘রেন্ট আইন’-এর বিরুদ্ধে ভারত সভা আন্দোলন গড়ে তোলে। সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা আন্দোলন ভারত সভার এক উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল। ১৮৭৭ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীদের বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করা হলে, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুরেন্দ্রনাথ প্রতিবাদ জানান এবং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বক্তৃতা দিয়ে এই পরীক্ষা ব্যবস্থার বিপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। ভারত সভার এই আন্দোলন সফল হয় এবং ইংরেজ সরকার পরীক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির উপর বিধিনিষেধ (ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট) আরোপিত হলে এবং অস্ত্র আইন বলবৎ করে ভারতীয়দের অস্ত্র সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হলে, ভারত সভা এর বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে আন্দোলন শুরু করে। ভারত সভার সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক আন্দোলন হল ইলবার্ট বিল আন্দোলন। বিচার ব্যবস্থায় ভারতীয় ও ইউরোপীয়দের মধ্যে বৈষম্য দূর করার জন্য লর্ড রিপন ‘ইলবার্ট বিল’ নামে এক আইনের পরিকল্পনা করেন। ইউরোপীয়রা এর প্রতিবাদে মুখর হলে সুরেন্দ্রনাথ এই প্রতিবাদের প্রত্যুত্তরে এবং ইলবার্ট বিলের সপক্ষে দেশ জুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয়দের স্বার্থ সুরক্ষিত করে বিলটি সংশোধন করা হয় এবং এর মূল আদর্শ ব্যর্থ হয়, তবুও ভারত সভা পরিচালিত এই আন্দোলন ভারতীয়দের জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত করে তোলে।

৩১. হিন্দুমেলার উদ্দেশ্য ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার একদিকে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা বিকাশের সহায়ক হয়। আবার অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষা, সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ যুবসমাজকে নিজের ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। এই অবস্থায় রাজনারায়ণ বসু, নবগোপাল মিত্র, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ বাঙালি মনীষীরা যুবসমাজে জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। দেশের যুবসমাজকে ঐতিহ্যমুখী করে তুলে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রসারের উদ্দেশ্যেই হিন্দুমেলার জন্ম হয়।

ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার হিন্দুমেলার তিনটি উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন—
১. জাতীয় ভাবের প্রসার ঘটানো।
২. জনগণের মধ্যে দেশাত্মবোধের ভাবনা জাগিয়ে তোলা।
৩. হিন্দুদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার মনোভাব গড়ে তোলা।
হিন্দুমেলার মূল লক্ষ্য ছিল স্বদেশ ভাবনার প্রসার।

হিন্দুমেলার প্রথম অধিবেশনে নানা প্রকার কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল। যেমন—হিন্দুদের মধ্যে ঐক্যস্থাপন, হিন্দু সমাজের উন্নয়নসাধন, ‘স্বজাতীয় বিদ্যানুশীলনের উন্নতিসাধনে নিয়োজিত’ ব্যক্তিদের সম্মানিত করা, প্রত্যেক মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থানের শিল্পজাত পণ্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। এছাড়াও হিন্দুমেলায় শরীরচর্চার বিষয়েও উৎসাহদান করা হয়। হিন্দুমেলার স্বদেশি ভাবধারার আনুকূল্যে নবগোপাল মিত্র ন্যাশনাল স্কুল, ন্যাশনাল সোসাইটি, ন্যাশনাল জিমনাসিয়াম স্থাপন করেন। ন্যাশনাল থিয়েটার স্থাপনেও হিন্দুমেলার প্রভাব ছিল। হিন্দুমেলার দ্বারা বাংলা ভাষার প্রসার ঘটে। এই মেলা দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। হিন্দুমেলা জাতির মনে আত্মনির্ভরতার বীজ বপন করে, যা পরবর্তীকালে স্বদেশি আন্দোলনের ভাবনাকে অণুপ্রাণিত করেছিল।

৩২. আনন্দমঠ উপন্যাসের ঐতিহাসিক পটভূমি ও এর গুরুত্ব আলোচনা করো।

উত্তর: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকারে বের হয়। এই উপন্যাসে আঠারো শতকের শেষ দিকে বাংলার এক সংকটজনক সময়ের ছবি ফুটে উঠেছে। উত্তরবঙ্গের সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কাল্পনিক গৌরবময় ভূমিকায় স্থাপন করে বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসে দেশাত্মবোধের জাগরণ ঘটিয়েছেন। মোগল যুগের সমাপ্তি এবং ইংরেজ আমলের গোড়ার দিক পর্যন্ত এই কাহিনিপর্ব বিস্তৃত। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও শাসকদের অত্যাচারে বিপর্যস্ত অসহায় মানুষদের রক্ষা করার জন্য সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহ শুরু করেন। তাঁদের সশস্ত্র সংগ্রামের কাহিনির ওপর আনন্দমঠের আখ্যান রচিত।

এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটে চরমপন্থী আন্দোলনের মাধ্যমে। বঙ্কিম মনে করেছেন, দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও আইনকানুনের অবনতি ঘটলে তা পুনরুদ্ধারের জন্য তথা দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র সংগ্রাম। তাই এই উপন্যাসে সন্ন্যাসীরা তুলসীতলায় বিষুর উপাসনা করার পাশাপাশি প্রয়োজনে হাতে বন্দুক তুলে নেয়। বঙ্কিমচন্দ্র দেশের মুক্তির জন্য ডাকাতি, লুণ্ঠন ইত্যাদিকে অন্যায় কাজ বলে মনে করেননি। তাই ভবানন্দ ও তার সন্তানদল চুরি-ডাকাতি করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। বঙ্কিমের মতে, উদ্দেশ্য মহৎ হলে উপায় অসৎ হলেও চলে। বলাবাহুল্য বিশ শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে ভারতের মুক্তি আন্দোলনে বিপ্লবীরা এই সশস্ত্র সংগ্রামের পথই গ্রহণ করেছিল।

আনন্দমঠের সন্তানদল সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর মতো দেশমাতৃকাকে কালীরূপে আরাধনা করেছে। বঙ্কিমের ভাষায় যিনি দশভুজা তিনিই দেশমাতা। সন্তানদলের বীরত্ব, গেরিলা কায়দায় যুদ্ধের কৌশল ও আত্মদান বাংলার জনমানসে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বাংলার তরুণ বিপ্লবীরা আনন্দমঠের সন্তানদলের আদর্শে অণুপ্রাণিত হয়ে দেশমাতৃকার মুক্তিসাধনে উদ্যত হয়েছিল। বঙ্কিমের জাতীয়তাবোধ ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রকাশ হল তাঁর ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত। ভবানন্দ যখন গেয়ে ওঠেন ‘বন্দে মাতরম/সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্য শ্যামলাং মাতরম’—তখন দেশমাতাকে উদ্দেশ্য করে এই গান রচিত হয়েছে। পরবর্তীকালে এই সংগীত জাতীয় আন্দোলনের রণসংগীতে পরিণত হয়। স্বদেশি যুগ থেকে বাংলার বিপ্লববাদী আন্দোলনে ও তারপর জাতীয় গণ-আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ বরাভয় মন্ত্র হিসাবে দেশবাসীকে উজ্জীবিত করে তোলে। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ বাঙালি জাতিকে জাতীয়তাবোধের মন্ত্রে দীক্ষিত করে।

৩৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাসে জাতীয়তাবাদের ধারণা বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘গোরা’ উপন্যাসটির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষের এক বিশেষ অধ্যায়কে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশি আন্দোলনের কারণে সারা বাংলা তখন দেশাত্মবোধের উন্মাদনায় অনুপ্রাণিত, আলোড়িত ছিল এবং নায়ক গোরা এই ভাবোন্মাদনার প্রতিমূর্তি ছিলেন। স্বদেশি আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং উপন্যাসের নায়ক গোরার মধ্যে স্বদেশ-ভাবনা ও জাতীয়তাবোধকে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সঞ্চারিত করেছেন। একদিকে স্বদেশি আন্দোলনে চরমপন্থী নামে পরিচিত জাতীয়তাবাদীদের উগ্রতা, অন্যদিকে নরমপন্থী কংগ্রেস রাজনীতির শহরকেন্দ্রিক অবস্থান—এই দুইটি বিষয় রবীন্দ্রনাথকে পীড়িত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ শহরের শিক্ষিত মানুষ ও অগণিত বঞ্চিত গ্রামীণ মানুষের মধ্যে বিস্তর দূরত্ব অনুভব করে লিখেছিলেন যে, ভদ্রসমাজ, শিক্ষিত সমাজ ও কলিকাতা সমাজের বাইরে এই নিভৃত প্রকাণ্ড গ্রাম্য ভারতবর্ষ কত বিচ্ছিন্ন, কত সংকীর্ণ, কত দুর্বল, তা গোরা গ্রামবাসীদের মধ্যে বাস না করলে কোনোমতেই কল্পনা করতে পারত না। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন এই বিচ্ছিন্ন ‘ভারতবর্ষ’ই এ দেশের বাস্তব রূপ এবং তাই এই ‘ভারতবর্ষ’কে অবহেলা করে দেশের মুক্তি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

‘গোরা’ চরিত্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তাকে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা করে তুলেছে। ইংরেজ শাসনের প্রতি গোরার বিদ্রোহী মনোভাব বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে। গোরা যৌবনের আবেগে ও দেশপ্রেমের উন্মাদনায় হিন্দুধর্মকে আশ্রয় করে জাতীয়তাবাদের পথ সন্ধান করে। উনিশ শতকের মধ্যভাগের পরে হিন্দুধর্ম রক্ষার তাগিদে সনাতন পথে জাতীয়তাবাদ প্রসারের উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল, যা কিশোর রবীন্দ্রনাথ হিন্দুমেলায় জাতীয়তাবাদ প্রচারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। গোরার মধ্যে হিন্দুধর্মীয় পথে জাতীয়তাবোধের উৎসাহ আসলে রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতার ফসল।

গোরা একসময় নিজের জন্মপরিচয় জানতে পারে যে সে হিন্দু ব্রাহ্মণ নয়, আইরিশ মাতার সন্তান। এই ঘটনা তার কাছে এক নতুন সত্যের উপলব্ধি নিয়ে আসে। জাতি-বর্ণ-ধর্ম-এর সংকীর্ণ গণ্ডিকে অতিক্রম করে সে নিজেকে ‘ভারতবর্ষীয়’ বলে পরিচয় দেয় এবং বলে, “ভারতবর্ষের সকলের জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন।” স্বামী বিবেকানন্দের সর্বধর্ম সমন্বিত জাতীয়তাবোধের ভাবনাই রবীন্দ্রনাথ এখানে তুলে ধরেছেন। গোরা সেই দেবতার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে চায় “যিনি কেবল হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা”। রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনাই গোরা রচনার অব্যবহিত পরেই রচিত একটি কবিতায় ফুটে ওঠে—”হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে/এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে।” উপন্যাসে পরেশবাবু ভারতবর্ষের মুক্ত প্রশান্ত ভাবনার প্রতিফলন এবং আনন্দময়ী সংস্কারমুক্ত ভারত জননী। গোরা সেই ভারতের মুক্ত মানব।

৩৪. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ চিত্রের প্রতীকী তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: স্বদেশি যুগে কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক রচনার পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষা ও শিল্পকলার ক্ষেত্রেও স্বদেশি তথা দেশজ ভাবধারার প্রকাশ দেখা যায়। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে স্বদেশিয়ানার জোয়ার আনেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি চিত্রশিল্পে দেশীয় ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে বেঙ্গল স্কুল বা ওরিয়েন্টাল আর্টের ভিত্তি স্থাপন করেন। স্বদেশি আন্দোলনের দেশজ ভাবধারার অভিঘাতে এই নতুন ঘরানার শিল্পকলার জন্ম হয়। এই সময় অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি মানুষের মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করে এবং এই ছবিটির মধ্য দিয়ে অবনীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবোধ ফুটে উঠেছে।

শিল্পীর ভাবনায়, ভারতমাতা গেরুয়া বসন পরিহিতা যোগিনী মূর্তি। তিনি বরাভয়দায়িনী এবং ত্যাগ ও বৈরাগ্যের মূর্ত প্রতীক। ভারতমাতার চার হাতে শোভা পায় রুদ্রাক্ষের মালা, শুভ্রবস্ত্র, পুঁথি ও শ্যামল শস্যগুচ্ছ। ভারতমাতা চিত্রটির মধ্য দিয়ে শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ধনধান্যপূর্ণ সমৃদ্ধশালী ভারতের ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন। এই ভারতবর্ষ শিক্ষা-সংস্কৃতিতে উন্নত এবং ত্যাগ ও শান্তির আদর্শে মহিমান্বিত। ভারতমাতা চিত্রটি স্বদেশি যুগে বিভিন্ন সভা, সমাবেশে সজ্জিত হত। ভগিনী নিবেদিতা মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় ছবিটির কল্পনা ও অনুভবের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।

৩৫. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য, বিস্তার ও সীমাবদ্ধতা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো।

উত্তর১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য:

১৮৫৭ সালের ১১ই মে মীরাট থেকে আসা সিপাহিরা দিল্লী দখল করে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা করার ফলে এই বিদ্রোহ এক সদর্থক রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে। ভারতবাসী কখনই কোম্পানির শাসন বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়নি, কিন্তু ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের আগে এমন বিশাল গণ-অভ্যুত্থান আগে কখনও হয়নি এবং এই প্রথমবার আঞ্চলিক গণ্ডির সীমারেখা ভেঙে যায়।

অনেক ইউরোপীয় ঐতিহাসিক এই বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ (Sepoy Mutiny) বলে অভিহিত করেছেন। সিপাহিরা ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রহরী, কিন্তু তাঁরা নানাভাবে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। স্বল্প বেতন, ইউরোপীয় কর্মচারীর দুর্ব্যবহার, পদোন্নতির সুযোগের অভাব এবং বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে সিপাহিদের মনে অসন্তোষ জমা হচ্ছিল। এনফিল্ড রাইফেলের নতুন টোটা, যাতে গোরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে বলে গুজব রটে, তা এই অসন্তোষে অগ্নিসংযোগ করে। সিপাহিরা মনে করেন যে কোম্পানি তাঁদের ধর্ম ও জাতি নাশ করার চেষ্টা করছে।

তবে অনেকের কাছেই এই বিদ্রোহ শুধুমাত্র সিপাহি বিদ্রোহ ছিল না। ডক্টর এ. আর. দেশাইয়ের মতে, “১৮৫৭-র বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনে নির্যাতিত বিভিন্ন শ্রেণীর ভারতবাসীর সম্মিলিত অসন্তোষের ফল। এই অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল রাজনৈতিক বিস্তৃতি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং নানা সামাজিক উদ্ভাবন থেকে।” ব্যারাকপুরের ব্রাহ্মণ সিপাহি মঙ্গল পান্ডের ফাঁসির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিদ্রোহ বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করার মাধ্যমে ক্রমে দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। বিদ্রোহীরা অভূতপূর্ব সাহস, আত্মত্যাগ ও দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছিলেন এবং সংগ্রামে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। কার্ল মার্কস এই বিদ্রোহের মধ্যে ভারতের শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের ঐক্যের প্রকাশ লক্ষ করেছিলেন এবং একে ‘জাতীয় বিদ্রোহ’ ও ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেন। বীর সাভারকরও এই বিদ্রোহকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক শশীভূষণ চৌধুরী একে একইসঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় যুদ্ধ ও গণবিদ্রোহ বলে ব্যাখ্যা করেছেন।

বিদ্রোহের বিস্তার:

মিরাটে বিদ্রোহ ও দিল্লি দখল ছিল সিপাহি বিদ্রোহের পূর্বাভাস মাত্র। ব্যারাকপুর সেনা ছাউনিতে মঙ্গল পান্ডের বিদ্রোহ ও ফাঁসির পর ভারতের বিভিন্ন সেনা ছাউনিতে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেয়। আম্বালা, লখনউ, মিরাট প্রভৃতি অঞ্চলের সেনারা কোম্পানির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। বাহাদুর শাহকে ভারত সম্রাট করার কথা ঘোষণা হলে ভারতের নানা প্রান্তে অভূতপূর্ব উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কানপুরে নানা সাহেবের সামরিক বাহিনী, ঝাঁসিতে রানি লক্ষ্মীবাঈ, অযোধ্যায় বেগম হজরত মহল, বেরিলিতে খান বাহাদুর খান, বিহারে কুনওয়ার সিং প্রমুখ বিদ্রোহে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ এবং মধ্য ভারতের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থান ঘটে। দিল্লি দখলের পরেই সব প্রতিবেশী রাজ্যের শাসকদের কাছে বিদ্রোহে সমর্থন চেয়ে ও যোগদানের আহ্বান জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

বিদ্রোহের সীমাবদ্ধতা:

অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও একবছরেরও বেশি সময় ধরে এই লড়াই চলে। বিদ্রোহীদের পক্ষে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করা খুবই কষ্টকর ছিল। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায়ই তাঁদের তরোবারির ভরসা নিয়ে লড়তে হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার জন্য দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বিদ্রোহী দলের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলাও ছিল প্রায় অসম্ভব কাজ। সহযোদ্ধার শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় প্রয়োজনের সময় একে অপরকে সাহায্যও করতে পারেনি।

বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকেই বিদেশি শাসনকে ঘৃণা করলেও, সামগ্রিক রাজনীতি বা দূরবর্তী ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। জন লরেন্সের মতে, তাঁদের মধ্যে একজনও যোগ্য নেতার আবির্ভাব ঘটলে ব্রিটিশদের পরাজয় নিশ্চিত ছিল। বিদ্রোহীরা উন্নত ইংরেজ সেনাবাহিনীর আক্রমণের মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়নি।

গোটা দেশ সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধভাবে বিদ্রোহীদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীরা এই বিদ্রোহ থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছিলেন, এমনকি ইংরেজদের সক্রিয়ভাবে সমর্থনও করেছেন। কলিকাতা ও বোম্বাইতে ইংরেজদের সাফল্য কামনা করে সভাও হয়েছে। ভারতীয় সৈন্যদের প্রায় অর্ধেক অংশই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেনি, অনেকে স্বদেশবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছে। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ও সুরেন্দ্রনাথ সেনের মতে, এই বিদ্রোহ সিপাহি বিদ্রোহ মাত্র ছিল এবং ভারতীয় জনসাধারণের এক বিরাট অংশ এতে যোগদান করেনি। তাঁদের মতে, সিপাহিদের অভ্যুত্থানের সুযোগে হতাশ সামন্তপ্রভুরা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে অংশ নেয় এবং বিদ্রোহগুলি বিক্ষিপ্ত ছিল। এর প্রভাব মূলত অযোধ্যা ও উত্তরপ্রদেশের কয়েকটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিদ্রোহীদের নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হতে পারেনি। দাদাভাই নৌরজির মতেও, ভারতীয় জনসাধারণ এই বিদ্রোহে শুধু অংশগ্রহণ করেনি তা নয়, উপরন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল এবং তাদের সমর্থন করেছিল।

৩৬. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ কি শুধুই সিপাহি বিদ্রোহ ছিল, নাকি গণ-অভ্যুত্থান? পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে আলোচনা করো।

উত্তর: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের চরিত্র ও প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এটি কেবল সিপাহি বিদ্রোহ ছিল নাকি গণ-অভ্যুত্থান বা জাতীয় বিদ্রোহ ছিল, তা নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে।

সিপাহি বিদ্রোহের সপক্ষে যুক্তি:

অনেক ইউরোপীয় ঐতিহাসিক, যেমন চার্লস রেইকস্, জন লরেন্স, আর্ল রবার্টস প্রমুখ, এই বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ (Sepoy Mutiny) বলে অভিহিত করেছেন। উনিশ শতকের বাঙালি তথা ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা যেমন কিশোরীচাঁদ মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দাদাভাই নৌরজি, সৈয়দ আহমেদ খান প্রমুখরাও এই বিদ্রোহকে সিপাহিদের অভ্যুত্থান হিসাবেই ব্যাখ্যা করেছেন। কিশোরীচাঁদ মিত্রের মতে, এই বিদ্রোহ ছিল অবশ্যই কেবলমাত্র সিপাহিদের অভ্যুত্থান এবং এতে গণবিদ্রোহের ছিটেফোঁটাও ছিল না। আধুনিক জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের মধ্যে রমেশচন্দ্র মজুমদার অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই বিদ্রোহ সিপাহি বিদ্রোহ মাত্র। সিপাহিরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্যই এই বিদ্রোহ করেছিল। ভারতীয় জনসাধারণের এক বিরাট অংশ এই বিদ্রোহে যোগদান করেনি। অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ সেনও রমেশচন্দ্রের বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেছেন যে, সিপাহিদের অভ্যুত্থানের সুযোগে একদল হতাশ সামন্তপ্রভু ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে এই বিদ্রোহের অংশ হয়েছিল। এই বিদ্রোহগুলি বিক্ষিপ্ত ছিল এবং এর প্রভাব অযোধ্যা ও উত্তরপ্রদেশের কয়েকটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিদ্রোহীদের নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হতে পারেনি। দাদাভাই নৌরজি মন্তব্য করেছিলেন যে, ভারতীয় জনসাধারণ এই বিদ্রোহে শুধু অংশগ্রহণ করেনি তা নয়, উপরন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাদের সমর্থন করেছিল। বিদ্রোহীরা জনগণের সহানুভূতি পেলেও গোটা দেশ সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি; অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীরা এই বিদ্রোহ থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছিলেন এবং কখনও কখনও ইংরেজদের সক্রিয়ভাবে সমর্থনও করেছিলেন। ভারতীয় সৈন্যদের প্রায় অর্ধেক অংশই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেনি এবং তারা স্বদেশবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছে।

গণ-অভ্যুত্থান বা জাতীয় বিদ্রোহের সপক্ষে যুক্তি:

অন্যদিকে, জে. বি. নর্টন প্রথম উল্লেখ করেন যে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ সামান্য সিপাহি বিদ্রোহ ছিল না, এই অভ্যুত্থান গণবিদ্রোহের রূপ ধারণ করেছিল। তিনি লিখেছিলেন অযোধ্যায় সারা দেশবাসীর সশস্ত্র অভ্যুত্থান দেখা গেল। ডাফ, কায়ে, বল, ম্যালেসন প্রমুখ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নর্টনের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন। কার্ল মার্কস এই বিদ্রোহের মধ্যে ভারতের শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের ঐক্যের প্রকাশ লক্ষ করেছিলেন এবং ব্রিটিশ শাসক যেটাকে সামরিক বিদ্রোহ বলে ভাবছে সেটা আসলে একটা জাতীয় বিদ্রোহ বলে মন্তব্য করেন। New York Daily Tribune পত্রিকায় তিনি একে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বিদ্রোহী সিপাহিরা ছিল জাতীয় বিদ্রোহের ‘ক্রিয়াশীল হাতিয়ার মাত্র’। পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক ড. শশীভূষণ চৌধুরী, ড. তারাচাঁদ প্রমুখ এই বিদ্রোহের মধ্যে গণ-উপাদান ও জাতীয় আবেগ-উদ্দীপনা লক্ষ করেছেন। ডক্টর এ. আর. দেশাইয়ের মতে, “১৮৫৭-র বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনে নির্যাতিত বিভিন্ন শ্রেণীর ভারতবাসীর সম্মিলিত অসন্তোষের ফল।” এই বিদ্রোহ দমন করতে ইংরেজদের এক বছর ধরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছিল, যা বিদ্রোহের জনসমর্থন প্রমাণ করে। ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও মধ্য ভারতের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থান ঘটে তাকে গণবিক্ষোভ বলা যেতে পারে। জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের অনেকেই, যেমন রজনীকান্ত গুপ্ত, মহাবিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি তাঁর ‘সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেছেন যে, সিপাহিরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে উজ্জীবিত হয়েই ইংরেজ শাসনের অবসান চেয়েছিল। বীর সাভারকরও এই বিদ্রোহকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক শশীভূষণ চৌধুরী একে একইসঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় যুদ্ধ ও গণবিদ্রোহ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। ঐতিহাসিক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ড. তারাচাঁদ এবং ড. সুশোভন সরকার সিপাহি বিদ্রোহকে জাতীয় সংগ্রাম আখ্যায় ভূষিত করেছেন। এঁদের মতে, বিশ্বের কোনো দেশের জাতীয় সংগ্রামেই শতকরা একশো ভাগ মানুষ অংশগ্রহণ করেনি, তবুও সেগুলি ইতিহাসের পাতায় মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসাবেই স্বীকৃতি পেয়েছে।

সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের চরিত্রটি জটিল ছিল এবং একে শুধুমাত্র সিপাহি বিদ্রোহ বা শুধুমাত্র গণ-অভ্যুত্থান বা জাতীয় সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এতে উভয় উপাদানেরই সংমিশ্রণ ঘটেছিল বলে অনেকে মনে করেন।

৩৭. মহাবিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর: ভারতের সদ্যোজাত শিক্ষিত সমাজ মহাবিদ্রোহকে স্বাগত জানায়নি। একইভাবে শিক্ষিত বাঙালি সম্প্রদায়ও এই বিদ্রোহ সম্পর্কে নানা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছিল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিদ্রোহের বিরুদ্ধে তাদের মতামত প্রকাশিত হতে থাকে। সমকালীন লেখক দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বেরিলিতে সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় সিপাহিদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সমালোচনায় সরব হয়েছিলেন। কিশোরীচাঁদ মিত্র, শম্ভুচরণ মুখার্জি, হরিশচন্দ্র মুখার্জি, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রমুখ বিদ্রোহীদের হিংসাত্মক কাজকর্মের নিন্দা করেছেন। এমনকি রাজনারায়ণ বসু বিদ্রোহীদের ‘অশুভ শক্তি’ বলে মন্তব্য করেন।

এই প্রসঙ্গে বিপিনচন্দ্র পাল বলেছেন, সমসাময়িক বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা সিপাহি বিদ্রোহের মধ্যে প্রাক-ব্রিটিশ যুগের নৈরাজ্যময় অবস্থার পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। ইংরেজি শিক্ষার প্রসার বুদ্ধিজীবী বাঙালিদের মনে উদারনৈতিক ভাবধারার সৃষ্টি করেছিল। বিদ্রোহী সিপাহিদের জয়লাভ ও ইংরেজ শাসনের অবসানের মধ্যে তাঁরা মিল, ব্যোমের উদারনৈতিক ভাবধারার অবলুপ্তির আশঙ্কা করেছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারক ও বাহক ছিল এই শিক্ষিত সমাজ। তাঁদের পক্ষে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-বিরোধী চরমপন্থী মতাদর্শকে সমর্থন জানানো সম্ভব হয়নি।

তবে কিছু ব্যতিক্রমী শিক্ষিত বাঙালি মহাবিদ্রোহে আলোড়িত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি বিদ্রোহের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন। কালীপ্রসন্ন সিংহ বিদ্রোহকে সরাসরি সমর্থন না করলেও ইংরেজ শাসকদের প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণের নিন্দা করেছিলেন। হিন্দু প্যাট্রিয়ট-এ লেখা হয়-‘ইংরেজের প্রতি বাঙালির আনুগত্যবোধ ছিল মস্তিষ্কপ্রসূত, হৃদয় থেকে তা নির্গত হয়নি।’

৩৮. সভা-সমিতির যুগে বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, জমিদার সভা এবং ব্রিটিশ ভারত সভার গুরুত্ব ও অবদান আলোচনা করো।

উত্তর: সভা-সমিতির যুগে উল্লিখিত তিনটি সভার গুরুত্ব ও অবদান নিচে আলোচনা করা হলো:

বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা:
১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমুখের উদ্যোগে ‘বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা’ গঠিত হয়। এই সভার সভাপতি ছিলেন ‘সংবাদ ভাস্কর’ পত্রিকার সম্পাদক পণ্ডিত গৌরীশংকর তর্কবাগীশ। অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, হরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, রামলোচন ঘোষ, কালীনাথ রায় প্রমুখ। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সরকারি নীতি ঘোষিত হবার পর এই সভা স্থাপিত হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনুশীলন ছিল এই সভার মূল উদ্দেশ্য। প্রাথমিক ভাবে এই সভা সাহিত্য-সংস্কৃতিমূলক প্রতিষ্ঠান হলেও, ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ ডিসেম্বর কালীনাথ রায়ের প্রস্তাব অনুযায়ী তা রাজনৈতিক সভায় পরিণত হয়। অনেকের মতে এই সভা ছিল ‘বাংলার প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান’। সরকারের বিবিধ নিয়ম-নীতির সমালোচনা করা হত এই সভায়। কিন্তু ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কিত আলোচনা এই সভায় স্থান পায়নি। তাই সভার সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং এই মতবিরোধের ফলে বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভার কাজ ক্রমে বন্ধ হয়ে যায়।

জমিদার সভা:
১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ ঠাকুরের উদ্যোগে এবং রাধাকান্ত দেবের সভাপতিত্বে জমিদার সভা প্রতিষ্ঠিত হয়। সভার সম্পাদক নিযুক্ত হন প্রসন্নকুমার ঠাকুর। এছাড়া এই সভার সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলেন রামকমল সেন, তারিণীচরণ মিত্র, থিওডর ডিকেন্স, জর্জ প্রিন্সেপ প্রমুখ। মোটামুটিভাবে এই সমিতির কাজকর্ম গণতান্ত্রিক নিয়মেই পরিচালিত হত এবং গোপন ভোটদানের মাধ্যমে এই সভার কার্যনির্বাহক সমিতির সভ্যরা নির্বাচিত হতেন। মূলত জমিদারদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত হলেও তিনটি বিষয়ে এই সভার গুরুত্ব দেখা যায়— নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরকারের কাছ থেকে দাবিদাওয়া আদায় এবং জমিদার ও প্রজা উভয়ের স্বার্থ সুরক্ষিত করার বিষয়ে এই সভায় উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সভার আদর্শ প্রচারের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর শাখা খোলা হয়। এর দ্বারা সংগঠিত আন্দোলন গড়ে ওঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। ভারতীয়দের প্রতি সহানুভূতিশীল উদারবাদী ইংরেজদের সহযোগিতা অর্জন করতে এই সভা সমর্থ হয়।

ব্রিটিশ ভারত সভা:
ভারতীয়দের অধিকার রক্ষা ও অভাব-অভিযোগের প্রতিকারের জন্য বাংলার নেতৃবৃন্দ আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন। এই উদ্দেশ্যে ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ‘জমিদার সভা’ ও ‘বেঙ্গল ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া সোসাইটি’ এই দুটি সংস্থাকে যুক্ত করে ‘ব্রিটিশ ভারত সভা’ বা ‘British-Indian Association’ নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি হয়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন এই সভার প্রথম সম্পাদক এবং রাধাকান্ত দেব ছিলেন প্রথম সভাপতি। এই সমিতি ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন। ভারতীয়দের অবস্থার উন্নতিসাধন করা, আইন ও প্রশাসন ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত করা ইত্যাদি ছিল এই সমিতির উদ্দেশ্য। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে চার্টার নবীকরণ আইন পাস করার সময় এই সমিতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে অনেকগুলি দাবি পেশ করে। এর মধ্যে ছিল আইনসভায় ভারতীয় প্রতিনিধি গ্রহণ, শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা করা ইত্যাদি। ইংরেজরা সব দাবি না মানলেও, আইন সভার থেকে প্রশাসনিক বিভাগকে কিছুটা আলাদা করে। এতে উৎসাহিত হয়ে সমিতির সদস্যরা শিক্ষাখাতে আরও ব্যয়বরাদ্দ মঞ্জুর করার ও ভারতে আই. সি. এস পরীক্ষা নেওয়ার জন্য দাবি তুলতে থাকেন। ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘ব্রিটিশ ভারত সভা’য় প্রথম জমিদারদের পাশাপাশি শিক্ষিত মধ্যবিত্তকেও দেখা যায়। জমিদার সভাতে জমিদার ও অভিজাত পরিবারের সদস্যদের একচ্ছত্র প্রাধান্য ছিল। ‘ব্রিটিশ ভারত সভা’ সেই একচ্ছত্র প্রাধান্যকে দুর্বল করে দেয়। এই সমিতির মধ্য দিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে মধ্যবিত্তরা প্রাধান্য পেতে শুরু করে।

৩৯. হিন্দুমেলার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিকাশে অবদান ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার একদিকে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা বিকাশের সহায়ক হলেও, অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ যুবসমাজকে নিজের ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এই অবস্থায় রাজনারায়ণ বসু, নবগোপাল মিত্র, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ বাঙালি মনীষীরা দেশের যুবসমাজকে ঐতিহ্যমুখী করে তুলে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রসারের উদ্দেশ্যেই হিন্দুমেলার প্রতিষ্ঠা করেন।

হিন্দুমেলার প্রধান উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে ছিল জাতীয় ভাবের প্রসার ঘটানো, জনগণের মধ্যে দেশাত্মবোধের ভাবনা জাগিয়ে তোলা এবং হিন্দুদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার মনোভাব গড়ে তোলা। হিন্দুমেলা নিছক হিন্দুধর্মের প্রতিষ্ঠান ছিল না, এর মূল লক্ষ্য ছিল স্বদেশ ভাবনার প্রসার। হিন্দুমেলার স্বদেশি ভাবধারার প্রভাবেই নবগোপাল মিত্র ন্যাশনাল স্কুল, ন্যাশনাল সোসাইটি, ন্যাশনাল জিমনাসিয়াম স্থাপন করেন এবং ন্যাশনাল থিয়েটার স্থাপনেও হিন্দুমেলার প্রভাব ছিল।

হিন্দুমেলা চোদ্দো বছর ধরে চলেছিল এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রসারে এর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। হিন্দুমেলার মাধ্যমে বাংলা ভাষার প্রসার ঘটেছিল, কারণ বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ বুঝতে পেরেছিল যে জাতীয় ভাষার উন্নতি ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি হতে পারে না। এই মেলা দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল এবং শরীরচর্চার বিষয়েও উৎসাহদান করা হত। হিন্দুমেলা জাতির মনে আত্মনির্ভরতার বীজ বপন করেছিল, যা পরবর্তীকালে স্বদেশি আন্দোলনের ভাবনাকে অণুপ্রাণিত করেছিল।

৪০. বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ এবং স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ রচনাগুলির জাতীয়তাবাদী ভাবনার তুলনামূলক আলোচনা করো।

উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ এবং স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ – উভয় রচনাই উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ভাবনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, যদিও তাদের প্রকাশের ধরণ ও আদর্শগত ভিত্তি ভিন্ন ছিল।

‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র আঠারো শতকের শেষভাগের সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায় দেশাত্মবোধের জাগরণ ঘটিয়েছেন। এই উপন্যাসে জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে চরমপন্থী আন্দোলনের মাধ্যমে। বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন যে, দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র সংগ্রাম প্রয়োজন। উপন্যাসের সন্তানদল দেশমাতৃকাকে দেবী রূপে আরাধনা করে এবং প্রয়োজনে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। দেশের মুক্তির জন্য তারা লুন্ঠন বা ডাকাতির মতো কাজকেও অন্যায় বলে মনে করে না, কারণ তাদের কাছে উদ্দেশ্য মহৎ হলে উপায় অসৎ হলেও চলে। ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র জননী ও জন্মভূমিকে এক করে দেখেছেন, যা পরবর্তীকালে জাতীয় আন্দোলনের রণসংগীতে পরিণত হয় এবং বিপ্লবীদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। ‘আনন্দমঠ’ মূলত সশস্ত্র পন্থায় দেশমাতৃকার মুক্তির আদর্শ প্রচার করে।

অন্যদিকে, স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধে জাতীয়তাবোধ তাঁর ফলিত বেদান্ত দর্শনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিবেকানন্দ ধর্ম, জাতি, ভাষার ঊর্ধ্বে উঠে এক ঐক্যবদ্ধ ভারত নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে ঐক্য ছাড়া ভারতের মুক্তি সম্ভব নয়। তিনি পরাধীনতার গ্লানি, পরানুকরণ এবং হীনমন্যতা ত্যাগ করে ভারতবাসীকে আত্মশক্তিতে জেগে ওঠার ডাক দিয়েছেন। তাঁর জাতীয়তাবাদে সামাজিক সাম্য ও ঐক্যের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতাকে জাতির প্রাণশক্তি ক্ষয়ের কারণ বলে মনে করতেন এবং শূদ্র বা শ্রমজীবী মানুষের উত্থানের মধ্যে দিয়ে এক নতুন সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার সম্ভাবনা দেখেছিলেন, যা তাঁর জাতীয়তাবাদী ভাবনার সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক চিন্তার সংযোগ ঘটায়। বিবেকানন্দের স্বদেশমন্ত্র ছিল দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা ও একাত্মবোধ – যেখানে ভারতের মাটি, মানুষ, সমাজ সবই আরাধ্য। তিনি ভারতবাসীকে সেবা ও কর্মের মাধ্যমে দেশের সার্বিক বিকাশে আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ‘বর্তমান ভারত’ প্রধানত আত্মবিশ্বাস, একতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সেবার মাধ্যমে জাতীয় জাগরণের কথা বলে।

সুতরাং, ‘আনন্দমঠ’ যেখানে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পরাধীনতা মোচনের কথা বলে এবং দেশমাতৃকাকে ধর্মীয় প্রতীকের সঙ্গে একীভূত করে, সেখানে ‘বর্তমান ভারত’ আত্মিক জাগরণ, সামাজিক সংস্কার, সর্বধর্ম সমন্বয় এবং ঐক্যের ভিত্তিতে এক শক্তিশালী জাতি গঠনের উপর গুরুত্ব আরোপ করে। উভয় রচনাই ভারতীয়দের মধ্যে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ সঞ্চারে সফল হয়েছিল, কিন্তু তাদের পথ ও দর্শন ছিল ভিন্ন।

৪১. রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের চরিত্র ও ঘটনাবলীর মাধ্যমে কীভাবে জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘গোরা’ উপন্যাসটির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষের এক বিশেষ অধ্যায়কে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশি আন্দোলনের কারণে সারা বাংলা তখন দেশাত্মবোধের উন্মাদনায় অনুপ্রাণিত, আলোড়িত ছিল। উপন্যাসের নায়ক গোরা এই ভাবোন্মাদনার প্রতিমূর্তি।

স্বদেশি আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং অংশগ্রহণ করেছিলেন। উপন্যাসের নায়ক গোরার মধ্যে স্বদেশ-ভাবনা, জাতীয়তাবোধকে রবীন্দ্রনাথ নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সঞ্চারিত করেছেন। একদিকে স্বদেশি আন্দোলনে চরমপন্থী নামে পরিচিত জাতীয়তাবাদীদের উগ্রতা, অন্যদিকে, নরমপন্থী কংগ্রেস রাজনীতির শহরকেন্দ্রিক অবস্থান—এই দুইটি বিষয় রবীন্দ্রনাথকে পীড়িত করে। রবীন্দ্রনাথ শহরের শিক্ষিত মানুষ ও অগণিত বঞ্চিত গ্রামীণ মানুষের মধ্যে বিস্তর দূরত্ব অনুভব করে লেখেন— “ভদ্রসমাজ, শিক্ষিত সমাজ ও কলিকাতা সমাজের বাইরে এই নিভৃত প্রকাণ্ড গ্রাম্য ভারতবর্ষ যে কত বিচ্ছিন্ন, কত সংকীর্ণ, কত দুর্বল তাহা গোরা গ্রামবাসীদের মধ্যে এমন করিয়া বাস না করিলে কোনোমতেই কল্পনা করিতে পারিত না।” রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন এই বিচ্ছিন্ন ‘ভারতবর্ষ’ই এ দেশের বাস্তব রূপ এবং তাই এই ‘ভারতবর্ষ’কে অবহেলা করে দেশের মুক্তি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

‘গোরা’ চরিত্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তাকে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা করে তুলেছে। ইংরেজ শাসনের প্রতি গোরার বিদ্রোহী মনোভাব বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন—স্কুলে পড়ার সময় সে উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করত ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে’, পথে সাহেব দেখলে তাদের তাড়া করত। গোরা যৌবনের আবেগে ও দেশপ্রেমের উন্মাদনায় হিন্দুধর্মকে আশ্রয় করে জাতীয়তাবাদের পথ সন্ধান করে। উনিশ শতকের মধ্যভাগের পরে হিন্দুধর্ম রক্ষার তাগিদে সনাতন পথে জাতীয়তাবাদ প্রসারের উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। কিশোর রবীন্দ্রনাথ হিন্দুমেলায় জাতীয়তাবাদ প্রচারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পরিচিত হয়েছিলেন। গোরার মধ্যে হিন্দুধর্মীয় পথে জাতীয়তাবোধের উৎসাহ আসলে রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতার ফসল।

গোরা একসময় নিজের জন্মপরিচয় জানতে পারে। জানতে পারে যে সে হিন্দু ব্রাহ্মণ নয়, আইরিশ মাতার সন্তান। একথা তার কাছে এক নতুন সত্যের উপলব্ধি নিয়ে আসে। জাতি-বর্ণ-ধর্ম-এর সংকীর্ণ গণ্ডিকে অতিক্রম করে সে নিজেকে ‘ভারতবর্ষীয়’ বলে পরিচয় দেয়। সে বলে, “ভারতবর্ষের সকলের জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন।” স্বামী বিবেকানন্দের সর্বধর্ম সমন্বিত জাতীয়তাবোধের ভাবনাই রবীন্দ্রনাথ এখানে তুলে ধরেন। গোরা সেই দেবতার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে চায় “যিনি কেবল হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা”। রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনাই গোরা রচনার অব্যবহতি পরেই রচিত একটি কবিতায় ফুটে ওঠে—হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে/এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে।

রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে পরেশবাবু ভারতবর্ষের মুক্ত প্রশান্ত ভাবনার প্রতিফলন, আনন্দময়ী সংস্কারমুক্ত ভারত জননী। গোরা সেই ভারতের মুক্ত মানব।

৪২. ঊনবিংশ শতকের বাংলায় লেখায় ও রেখায় জাতীয়তাবোধের বিকাশের প্রক্রিয়া আলোচনা করো, বিশেষত সাহিত্য ও চিত্রকলায় এর প্রকাশ বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: ঊনবিংশ শতকে শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা ও জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। ইংরেজ শাসন সম্পর্কে সম্পূর্ণ মোহমুক্ত হয়ে তারা প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, সভা, সমিতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দিকে দিকে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রসার ঘটতে থাকে। শিক্ষিত বাঙালি সমাজ ভারতবাসীকে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে প্রয়াসী হয়। কখনও কলমের আঁচড়ে আবার কখনও তুলির টানে ফুটে ওঠে স্বদেশের প্রতি তীব্র আবেগ। বাঙালির লেখায় রেখায় বিকশিত হয়ে ওঠে জাতীয়তাবোধ তথা স্বদেশ ভাবনা।

সাহিত্যে জাতীয়তাবোধ (লেখায়):

দিনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পন’, নবীনচন্দ্র সেনের ‘পলাশীর যুদ্ধ’ প্রভৃতি নাটক দেশবাসীকে জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করে তোলে। রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় লেখেন-‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়।’ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের স্বদেশ-প্রেম বিষয়ক কবিতাগুলি মানুষকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করে তোলে। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরানী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা প্রভৃতি উপন্যাস, স্বামী বিবেকানন্দের বর্তমান ভারত, জ্ঞানযোগ, রাজযোগ প্রভৃতি প্রবন্ধগুলি দেশবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটায়।

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তাঁর ধারণার পরিচয় পাওয়া যায়। এই উপন্যাসে আঠারো শতকের শেষ দিকে বাংলার এক সংকটজনক সময়ের ছবি ফুটে উঠেছে। উত্তরবঙ্গের সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কাল্পনিক গৌরবময় ভূমিকায় স্থাপন করে বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসে দেশাত্মবোধের জাগরণ ঘটিয়েছেন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও শাসকদের অত্যাচারে বিপর্যস্ত অসহায় মানুষদের রক্ষা করার জন্য সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহ শুরু করেন। এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটে চরমপন্থী আন্দোলনের মাধ্যমে। বঙ্কিম মনে করেছেন, দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও আইনকানুনের অবনতি ঘটলে তা পুনরুদ্ধারের জন্য তথা দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র সংগ্রাম। আনন্দমঠের সন্তানদল সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর মতো দেশমাতৃকাকে কালীরূপে আরাধনা করেছে। বঙ্কিমের ভাষায় যিনি দশভুজা তিনিই দেশমাতা। বঙ্কিমের জাতীয়তাবোধ ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রকাশ হল তাঁর ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত। ভবানন্দ যখন গেয়ে ওঠেন ‘বন্দে মাতরম/সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্য শ্যামলাং মাতরম’-তখন দেশমাতাকে উদ্দেশ্য করেই এই গান রচিত হয়েছে। পরবর্তীকালে এই সংগীত জাতীয় আন্দোলনের রণসংগীতে পরিণত হয়। স্বদেশি যুগ থেকে বাংলার বিপ্লববাদী আন্দোলনে ও তারপর জাতীয় গণ-আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ বরাভয় মন্ত্র হিসাবে দেশবাসীকে উজ্জীবিত করে তোলে। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ বাঙালি জাতিকে জাতীয়তাবোধের মন্ত্রে দীক্ষিত করে।

ঊনিশ শতকের শেষ দশকে স্বামী বিবেকানন্দ ধর্ম আন্দোলনে নতুন প্রাণসঞ্চার করেন। বিবেকানন্দের জাতীয়তাবোধ ধর্মীয় ভাবনার সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। বিবেকানন্দ সর্বধর্ম সমন্বিত এক ঐক্যবদ্ধ ভারত নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি অনুভব করেছিলেন যে ভারতবাসী যদি জাতি, ধর্ম, ভাষা ইত্যাদির বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে তবে ভারতের মুক্তি সম্ভব নয়। বিবেকানন্দের এই জাতীয়তাবোধের প্রকাশ ঘটেছে ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধটিতে। ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধে স্বামীজির স্বদেশের প্রতি আবেগ ফুটে উঠেছে। ‘স্বদেশ মন্ত্র’ শীর্ষক অনুচ্ছেদটিতে আত্মবিশ্বাসহীন, দুর্বল ভারতবর্ষের প্রতি স্বামীজি ধিক্কার জানিয়েছেন। তিনি ভারতবাসীকে জড়তা, অলসতা, হীনমন্যতা ত্যাগ করে আত্মশক্তিতে জেগে ওঠার ডাক দেন। দেশবাসীকে স্বদেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন-“ভুলিও না, তুমি জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত।” বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা জাতির প্রাণশক্তিকে ক্ষয় করে। তিনি ভারতবাসীকে সংকীর্ণ জাতপাতের গণ্ডি অতিক্রম করে এক হওয়ার আহ্বান জানান। বিবেকানন্দের স্বদেশমন্ত্র ছিল দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা, আবেগ। তিনি এই প্রবন্ধে লেখেন- “ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসী।” দেশের সঙ্গে এই একাত্মবোধকেই তিনি ভারতবাসীর মধ্যে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থ দেশপ্রেমিকদের জাতীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত করে।

১৯১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘গোরা’ উপন্যাসটির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষের এক বিশেষ অধ্যায়কে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশি আন্দোলনের কারণে সারা বাংলা তখন দেশাত্মবোধের উন্মাদনায় অনুপ্রাণিত, আলোড়িত। নায়ক গোরা এই ভাবোন্মাদনার প্রতিমূর্তি। স্বদেশি আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং অংশগ্রহণ করেছিলেন। উপন্যাসের নায়ক গোরার মধ্যে স্বদেশ-ভাবনা, জাতীয়তাবোধকে রবীন্দ্রনাথ নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সঞ্চারিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ শহরের শিক্ষিত মানুষ ও অগণিত বঞ্চিত গ্রামীণ মানুষের মধ্যে বিস্তর দূরত্ব অনুভব করে মনে করতেন এই বিচ্ছিন্ন ‘ভারতবর্ষ’ই এ দেশের বাস্তব রূপ এবং এই ‘ভারতবর্ষ’কে অবহেলা করে দেশের মুক্তি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ‘গোরা’ চরিত্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তাকে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা করে তুলেছে। ইংরেজ শাসনের প্রতি গোরার বিদ্রোহী মনোভাব বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে। গোরা যৌবনের আবেগে ও দেশপ্রেমের উন্মাদনায় হিন্দুধর্মকে আশ্রয় করে জাতীয়তাবাদের পথ সন্ধান করে। গোরা একসময় নিজের জন্মপরিচয় জানতে পেরে জাতি-বর্ণ-ধর্ম-এর সংকীর্ণ গণ্ডিকে অতিক্রম করে সে নিজেকে ‘ভারতবর্ষীয়’ বলে পরিচয় দেয়। সে বলে, “ভারতবর্ষের সকলের জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন।” স্বামী বিবেকানন্দের সর্বধর্ম সমন্বিত জাতীয়তাবোধের ভাবনাই রবীন্দ্রনাথ এখানে তুলে ধরেন। গোরা সেই দেবতার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে চায় “যিনি কেবল হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা”। রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনাই গোরা রচনার অব্যবহতি পরেই রচিত একটি কবিতায় ফুটে ওঠে-হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে/এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে পরেশবাবু ভারতবর্ষের মুক্ত প্রশান্ত ভাবনার প্রতিফলন, আনন্দময়ী সংস্কারমুক্ত ভারত জননী। গোরা সেই ভারতের মুক্ত মানব।

চিত্রকলায় জাতীয়তাবোধ (রেখায়):

স্বদেশি যুগে কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক রচনার পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষা ও শিল্পকলার ক্ষেত্রেও স্বদেশি তথা দেশজ ভাবধারার প্রকাশ দেখা যায়। কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার পীঠস্থান হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল ভাবনা ঠাকুরবাড়ির পরবর্তী প্রজন্মকে শিল্পকর্মে উৎসাহিত করে তোলে। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে স্বদেশিয়ানার জোয়ার আনেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি চিত্রশিল্পে দেশীয় ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে বেঙ্গল স্কুল বা ওরিয়েন্টাল আর্টের ভিত্তি স্থাপন করেন। স্বদেশি আন্দোলনের দেশজ ভাবধারার অভিঘাতে এই নতুন ঘরানার শিল্পকলার জন্ম হয়।

এই সময় অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি মানুষের মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। এই ছবিটির মধ্য দিয়ে অবনীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবোধ ফুটে উঠেছে। শিল্পীর ভাবনায়, ভারতমাতা গেরুয়া বসন পরিহিতা যোগিনী মূর্তি। তিনি বরাভয়দায়িনী। ত্যাগ ও বৈরাগ্যের মূর্ত প্রতীক। ভারতমাতার চার হাতে শোভা পায় রুদ্রাক্ষের মালা, শুভ্রবস্ত্র, পুঁথি ও শ্যামল শস্যগুচ্ছ। ভারতমাতা চিত্রটির মধ্য দিয়ে শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ধনধান্যপূর্ণ সমৃদ্ধশালী ভারতের ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন। এই ভারতবর্ষ শিক্ষা-সংস্কৃতিতে উন্নত ভারতবর্ষ। ত্যাগ ও শান্তির আদর্শে মহিমান্বিত ভারতবর্ষ। ভারতমাতা চিত্রটি স্বদেশি যুগে বিভিন্ন সভা, সমাবেশে সজ্জিত হত। ভগিনী নিবেদিতা মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় ছবিটির কল্পনা ও অনুভবের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠভ্রাতা গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর চিত্রশিল্পে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। সমকালীন সমাজ ও সময়ের ছবি শিল্পীর তুলির টানে ব্যঙ্গাত্মক রূপে ফুটে ওঠে। তিনি ছিলেন রবি বর্মার সমকালীন চিত্রকর। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম ব্যঙ্গচিত্রকর হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর ব্যঙ্গচিত্রগুলিতে যেমন বিদেশি শাসকদের কটাক্ষ করা হয়, একই রকমভাবে সমাজের নানা অসংগতি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিমায় সেই চিত্রে ফুটে ওঠে। ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে মাথা নোয়ানো মানুষ বা শহুরে জীবনের কৃত্রিম সাহেবিয়ানা- যে-কোনো কিছুকেই তিনি বিদ্ধ করতেন তাঁর শ্লেষাত্মক কার্টুন চিত্রে। গগনেন্দ্রনাথ কোনো প্রকার তোষামোদে বিশ্বাস করতেন না। তাই তাঁর ব্যঙ্গচিত্র হয়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিক সমাজের সমালোচনার প্রতিফলন। তাঁর ব্যঙ্গচিত্রগুলিতে বিদেশি শাসকদের পাশাপাশি দেশীয় নেতারাও ব্যঙ্গের আওতার মধ্যে পড়েছেন। এমনকি, রবীন্দ্রনাথও তাঁর ব্যঙ্গচিত্রের বিষয় হয়েছেন। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর আবিষ্কার, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের গবেষণা, রবীন্দ্রনাথের প্রথম বিমান চড়া, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ ইত্যাদি নিয়ে কার্টুন চিত্রগুলি ইতিহাসের অমূল্য দলিল।

Ron'e Dutta

Ron'e Dutta

Ron'e Dutta is a journalist, teacher, aspiring novelist, and blogger who manages Online Free Notes. An avid reader of Victorian literature, his favourite book is Wuthering Heights by Emily Brontë. He dreams of travelling the world. You can connect with him on social media. He does personal writing on ronism.

Only for registered users

Meaning
Tip: select a single word for meaning & synonyms. Select multiple words normally to copy text.